পাবনায় অসময়ে পেঁয়াজে পচন, দিশাহারা চাষিরা
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৬ এএম
পাবনায় সংরক্ষিত দেশি ও হাইব্রিড জাতের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়েছে। বাম্পার ফলনের পরও বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন চাষিরা।

ভেরিক্সা নিউজ ডেস্ক
মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশ: ০৯:৫৩
পাবনায় সংরক্ষিত পেঁয়াজে অসময়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ পচন। জেলার সুজানগর ও চাটমোহর উপজেলায় সনাতন পদ্ধতির চাতাল তো বটেই, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তৈরি আধুনিক সংরক্ষণাগারে রেখেও ঠেকানো যাচ্ছে না এই পচন রোগ।
ইতোমধ্যে দেশি ও হাইব্রিড জাতের সংরক্ষিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বাম্পার ফলন হওয়া সত্ত্বেও অসময়ের এই বিপর্যয়ে উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা।
কৃষকরা জানান, সাধারণত বাংলা কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে সংরক্ষিত পেঁয়াজে পচন ধরা বা অঙ্কুরোদ্গম দেখা যায়। কিন্তু এবার ভরা আষাঢ় মাসেই এমন বিপর্যয় দেখা দেওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
চাটমোহর উপজেলার সোহাগবাড়ী এলাকার পেঁয়াজচাষি ফজলু বলেন, “এবার ৪০০ মণের মতো পেঁয়াজ রেখেছিলাম। কিন্তু এখনই প্রায় ১০০ মণের বেশি পেঁয়াজে পচন ধরেছে। বাধ্য হয়ে নামমাত্র দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে মণপ্রতি প্রায় হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে।”
পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলে প্রায় ৪০০ মণ দেশি পেঁয়াজ সরকারি সংরক্ষণাগারে রেখেছিলেন সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রামের চাষি মনোয়ার পারভেজ মানিক। যথাযথ নিয়ম মেনে সংরক্ষণ করার পরও পেঁয়াজের পচন আটকানো যায়নি। ছত্রাক ও ভাইরাসের সংক্রমণে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি পেঁয়াজে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে।
বর্তমানে ভালো পেঁয়াজের বাজারদর মণপ্রতি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না।
হাজির হাটে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি এলাকার রহিম বিশ্বাস বলেন, “১৮০ মণ পেঁয়াজের প্রায় অর্ধেকেই পচন ধরছে। সেগুলো বাজারে আনলে দাম বলছে ৩০০-৪০০ টাকা মণ। সর্বোচ্চ ৬০০-৭০০ টাকা বলছে। কৃষকের বাঁচার আর উপায় নাই।”
সুজানগর উপজেলার কোলাদি গ্রামের কৃষক আকাশ প্রাং বলেন, “১৫ বিঘা আবাদ করছিলাম। ফলন হইছে ৮০-১০০ মণ। মণপ্রতি হাজার থেকে বারোশ টাকা খরচ পড়ছে। শুরুতে চার থেকে সাতশ টাকা দর থাকায় বেচি নাই। এখন পচে সেই দর পাওয়াও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, অসময়ের এই পচনের পেছনে মূলত অতিরিক্ত হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ চাষ, প্রতিকূল আবহাওয়া ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দায়ী।
বেশি ফলনের আশায় কৃষকরা এবার প্রচুর হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন। তবে এ জাতের পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণের উপযোগী নয়। পাশাপাশি রোপণ ও উত্তোলনের সময় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, বাতাসে আর্দ্রতা এবং বেশি তাপমাত্রার কারণে পেঁয়াজে আর্দ্রতা থেকে গেছে।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে আধুনিক সংরক্ষণাগারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়ায় পচনের মাত্রা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
পাবনা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার ৫৪ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৪৭৩ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে জেলায় রেকর্ড প্রায় ৯ লাখ ৯৫ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে মজুত রয়েছে ২ লাখ ৭১ হাজার ৫৫ মেট্রিক টন।
উৎপাদিত পেঁয়াজ সংরক্ষণে জেলার কৃষকদের মধ্যে এ পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ৩৩০টি এয়ার ফ্লো মেশিন বা বায়ুপ্রবাহ যন্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গত বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২ হাজার ৩৩০টি এবং চলতি বছর অন্যান্য সংস্থা ৩ হাজার মেশিন বিতরণ করেছে।
তবে এসব যন্ত্রের মাধ্যমে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার কৃষক পেঁয়াজ সংরক্ষণের সুবিধা পাচ্ছেন। ফলে জেলার বাকি হাজার হাজার সাধারণ কৃষক এখনো আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তির সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলেন, উত্তোলন মৌসুমে কয়েক দিন বৃষ্টিসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পেঁয়াজের প্রাথমিক ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, বেশি ফলনের আশায় স্বল্পমেয়াদি হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ চাষ, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সংরক্ষণাগারের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়া এবং অনেক কৃষকের গাদাগাদি করে পেঁয়াজ সংরক্ষণের কারণে পচনের মাত্রা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
তবে উৎপাদনের পরিমাণ বিবেচনায় কৃষকদের সামগ্রিক লোকসান হবে না বলে আশা প্রকাশ করেছেন এই কর্মকর্তা। বর্তমানে যে পরিমাণ পেঁয়াজ মজুত রয়েছে, তাতে বাজারে সংকটের সম্ভাবনাও নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।
ফটো গ্যালারি

- #ভেরিক্সা নিউজ
- #Verixa News
- #পাবনা
- #পেঁয়াজ
- #পেঁয়াজচাষি
- #কৃষি
- #সুজানগর
- #চাটমোহর
- #পেঁয়াজের বাজার
- #কৃষকের লোকসান
ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।





