ভারতের ‘ককরোচ’ আন্দোলন কি মোদির বিজেপিকে রাজনীতি বদলাতে বাধ্য করবে?
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম
ভারতে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আন্দোলন শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে বিজেপির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও কয়েকটি উপনির্বাচনে বিজেপির পরাজয়ের পর বিশ্লেষকেরা বলছেন, দলটির রাজনৈতিক শক্তি অটুট থাকলেও তরুণদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ও প্রচলিত রাজনৈতিক বয়ান প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

ভেরিক্সা নিউজ ডেস্ক
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশ: ৩:৪৬ পিএম
সূত্র: আল-জাজিরা
ভারতে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কয়েক সপ্তাহের ছাত্র আন্দোলন, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে উপনির্বাচনের ধাক্কার পর প্রশ্ন উঠেছে—ভারতের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক দলটি কি এবার তার কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হবে?
গত ৪ আগস্ট বিহারের পাটনা শহরের ব্যাংকিপুর আসনের উপনির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা খায় বিজেপি। তিন দশক ধরে দলটির দখলে থাকা আসনটি জয় করে রাজনৈতিক কৌশলবিদ থেকে রাজনীতিক হওয়া প্রশান্ত কিশোরের নেতৃত্বাধীন জন সুরাজ পার্টি। আসনটি কয়েক মাস আগেও বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের দখলে ছিল।
এই পরাজয়ের দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে সাত সপ্তাহ ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। ওই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম।
চলতি বছরের মে মাসে ইনস্টাগ্রামে এই প্ল্যাটফর্মের যাত্রা শুরু হয়। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার তরুণদের ‘ককরোচ’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করার পর ওই মন্তব্য ঘিরে ক্ষোভ থেকে আন্দোলনটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।
আন্দোলনের সময় বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন জেন-জি বিক্ষোভকারীদের ‘ভাইরাস’ এবং ‘ককরোচ গ্যাং’ হিসেবে সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার দলই ব্যাংকিপুর আসন হারায়। এরপর তরুণ ভোটারদের সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়।
আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের উদ্দেশে একাধিক সেলফি-ধাঁচের ভিডিও প্রকাশ করেন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেন।
বিজেপি তরুণদের কাছে পৌঁছাতে ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণাও বাড়ায়। উত্তর প্রদেশে জেন-জি তরুণদের লক্ষ্য করে স্কুলে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং উদ্যোগ চালু করা হয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ এখনো বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না। তাদের কেউ কেউ এটিকে মূলত জনমত ও রাজনৈতিক ধারণা নিয়ন্ত্রণের লড়াই হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অতীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনকে ‘দেশবিরোধী’, ‘বিদেশি অর্থায়নপুষ্ট’ কিংবা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার যে কৌশল বিজেপি ব্যবহার করেছে, এবারের আন্দোলনে সেটি আগের মতো কার্যকর হয়নি।
কারণ, এই আন্দোলন কোনো একটি ধর্ম, জাত বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিজেপির ঐতিহ্যগত ভোটভিত্তির অংশ হিসেবে বিবেচিত উচ্চবর্ণের হিন্দু তরুণদেরও এতে অংশ নিতে দেখা গেছে।
আন্দোলনটি প্রধানমন্ত্রী মোদির তরুণদের ওপর স্বাভাবিক প্রভাব রয়েছে—বিজেপির এমন প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বিজেপি তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে দুটি আসনে পরাজিত হয়। বিহারের ব্যাংকিপুরের পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশের দাতিয়াতেও হারে দলটি। তবে গুজরাটের মঞ্জলপুর আসন ধরে রাখতে সক্ষম হয় বিজেপি।
বিশ্লেষকেরা অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, কয়েকটি উপনির্বাচনের ফল দেখে বিজেপির জাতীয় রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। দলটির নির্বাচনী কাঠামো এখনো শক্তিশালী এবং অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ধাক্কা সামলে ফিরে আসার নজির রয়েছে।
দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের অনেকেই বলছেন, তাদের ক্ষোভের কারণ কেবল একটি মন্তব্য বা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কর্মসংস্থান সংকট, শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু এই অসন্তোষের পেছনে কাজ করছে।
আন্দোলনের পরবর্তী ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ শিগগিরই সরাসরি নির্বাচনী রাজনৈতিক দলে রূপ নেবে—এমন সম্ভাবনা কম।
বরং একটি চাপ সৃষ্টিকারী সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর নীতি ও রাজনৈতিক এজেন্ডায় প্রভাব বিস্তার করাই এর দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা হতে পারে।
তবে বিজেপি তার হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনৈতিক এজেন্ডা ছেড়ে পুরোপুরি কর্মসংস্থান ও শিক্ষাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে চলে যাবে—এমন সম্ভাবনাও কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তাদের মতে, নির্বাচনী শক্তির বিচারে বিজেপি এখনো অত্যন্ত প্রভাবশালী। কিন্তু ‘ককরোচ’ আন্দোলন দলটির রাজনৈতিক ক্ষমতার চেয়ে বেশি আঘাত করেছে তার গ্রহণযোগ্যতা এবং তরুণদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন তৈরির সক্ষমতায়।
রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে তৈরি এই ব্যবধানই ভবিষ্যতে বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ফটো গ্যালারি

- #ভারত
- #নরেন্দ্র মোদি
- #বিজেপি
- #ককরোচ আন্দোলন
- #ককরোচ জনতা পার্টি
- #জেন-জি
- #ছাত্র আন্দোলন
- #ভারতীয় রাজনীতি
- #Verixa News
ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।






