নেপালে মৃত্যু ১,০১০, নিখোঁজ ৪,৫৯৯—সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে টানেলে শত শত মানুষের সন্ধান
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম
নেপালের ভোটেকোশি বিপর্যয়ে সরকারি হিসাবে উদ্ধার হওয়া মরদেহ ও দেহাবশেষের সংখ্যা বেড়ে ১,০১০-এ পৌঁছেছে এবং এখনো ৪,৫৯৯ জন নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন। সবচেয়ে কঠিন অভিযান চলছে ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর টানেলে, যেখানে শত শত মানুষ আটকে বা নিখোঁজ থাকার আশঙ্কায় নেপালি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা অনুসন্ধান চালাচ্ছেন।

ভেরিক্সা নিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নেপাল–চীন সীমান্তবর্তী রাসুয়া অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ ভোটেকোশি আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের প্রায় এক সপ্তাহ পরও নতুন নতুন এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধারের সঙ্গে বাড়ছে প্রাণহানির সরকারি হিসাব।
নেপাল পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১০ জনের মরদেহ বা দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৪ হাজার ৫৯৯ জন এখনো নিখোঁজ, যোগাযোগবিচ্ছিন্ন অথবা তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি।
এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে জটিল অধ্যায় এখন ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর টানেল।
নেপালি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে Nepal Police ও Armed Police Force Nepal-এর সদস্যদের পাশাপাশি ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন টানেল ও ধ্বংসস্তূপের ভেতরে সম্ভাব্য জীবিত মানুষের সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছেন।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন hydropower project এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত ২৭৯ জন কর্মীকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলোতে এখনো প্রায় ৬০০ মানুষ আটকে বা নিখোঁজ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
Upper Trishuli-1, Upper Trishuli-3A, Upper Trishuli-3B, Chilime, Langtang Khola, Mailung Khola এবং Rasuwagadhi-সহ একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে ঘিরে বিশেষ অভিযান চলছে।
কোথাও টানেলের পুরোনো প্রবেশপথ কাদা ও পাথরে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও পানি ও ঘন পলির স্তর এতটাই বেশি যে উদ্ধারকারীদের পক্ষে ভেতরে দীর্ঘ দূরত্ব অগ্রসর হওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এই কারণে নেপালি সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা একাধিক স্থানে বিকল্প প্রবেশপথ তৈরির চেষ্টা করছেন।
Excavator, শক্তিশালী pump, drilling equipment এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ বা controlled blasting ব্যবহার করে ধ্বংসাবশেষ সরানো হচ্ছে।
কিছু টানেলের ভেতরে সম্ভাব্য ফাঁকা স্থান ও জীবনের চিহ্ন খুঁজতেও বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে সর্বশেষ সরকারি তথ্য পর্যন্ত টানেলের গভীরে আটকে থাকার আশঙ্কা করা শত শত মানুষের বড় অংশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি।
নতুন করে শত শত মানুষের জীবিত অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে—এমন কোনো সরকারি ঘোষণাও এখনো আসেনি।
এ কারণে প্রতিটি টানেলে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ধাপে ধাপে এগোচ্ছেন সেনাবাহিনী ও বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা।
কোনো কোনো স্থানে উদ্ধারকারীদের দড়ির সহায়তায় প্রবেশ করতে হচ্ছে। আবার কোনো টানেলে কাদা ও পানি সরিয়ে উদ্ধারপথ তৈরি না করা পর্যন্ত গভীরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এই অভিযান সময়সাপেক্ষ হলেও সম্ভাব্য জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশা এখনো ছাড়েনি উদ্ধারকারী বাহিনী।
অন্যদিকে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
নেপাল পুলিশের সর্বশেষ সামগ্রিক হিসাবে ৪ হাজার ৫৯৯ জন নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন।
পুলিশের বিভিন্ন নথিতে নিখোঁজ নেপালি, বিদেশি এবং টেলিফোনে রিপোর্ট হওয়া ব্যক্তিদের আলাদা উপ-তথ্যও রয়েছে। তবে এসব উপশ্রেণির সংখ্যার সঙ্গে সর্বশেষ সরকারি মোট সংখ্যার সরাসরি সামঞ্জস্য না থাকায় মূল সরকারি মোট ৪ হাজার ৫৯৯-ই বর্তমান প্রতিবেদনে ব্যবহার করা হচ্ছে।
নেপাল পুলিশের নির্দিষ্ট অপারেশনাল হিসাবে বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ৪ হাজার ২৭০ জনকে সরাসরি উদ্ধার করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৩ জন পুরুষ এবং ১ হাজার ২৫৪ জন নারী। আরও ১৩ জনের পরিচয় বা শ্রেণি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ হাজার ৪৫৩ জনকে বিভিন্ন holding centre-এ নেওয়া হয়েছে।
তবে এই ৪ হাজার ২৭০ সংখ্যাকে নেপাল সরকারের সামগ্রিক উদ্ধার বা evacuation হিসাবের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যাবে না।
National Disaster Risk Reduction and Management Authority (NDRRMA)-এর আগের সমন্বিত হিসাবে ১১ হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার বা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
পুলিশের ৪ হাজার ২৭০ হলো তাদের নিজস্ব নথিভুক্ত সরাসরি উদ্ধার কার্যক্রমের হিসাব, অন্যদিকে NDRRMA-এর সংখ্যা বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও evacuation কার্যক্রমের সম্মিলিত হিসাব।
মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যাও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
১ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা পর্যন্ত Nepal Police সরাসরি ১ হাজার ৭টি মরদেহ বা দেহাবশেষ উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছিল। পরবর্তী সরকারি পুলিশ-ভিত্তিক হিসাবে সংখ্যাটি বেড়ে ১ হাজার ১০-এ পৌঁছেছে।
মরদেহ শনাক্ত ও সংরক্ষণ এখন আলাদা বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।
পুলিশের সর্বশেষ তথ্যে ৫৮১টি মরদেহ বা দেহাবশেষ প্রয়োজনীয় ফরেনসিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে মাটিতে সমাহিত বা নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে।
৫৬টি মরদেহ শনাক্তের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
শুধু চিতওয়ানেই ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদী থেকে ৩২১টি মরদেহ বা দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২৮০টির ফরেনসিক পরীক্ষা এবং DNA নমুনা সংগ্রহের পর দেবঘাটের নির্ধারিত স্থানে সাময়িকভাবে দাফন বা সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে।
দীর্ঘ সময় নদী ও পানিতে থাকার কারণে অনেক মরদেহ পচে বা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই কারণে DNA ও forensic identification-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে নেপাল সরকার।
অশনাক্ত মরদেহ থেকে সংগৃহীত DNA নমুনা সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে পরবর্তী সময়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।
ভারতীয় ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাও নেপালের সংশ্লিষ্ট দলকে এ কাজে সহায়তা করছেন।
এদিকে নদীর পরিস্থিতি প্রথম দিনের মতো ভয়াবহ না থাকলেও নতুন ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
নেপালের Department of Hydrology and Meteorology-এর ১ সেপ্টেম্বরের পর্যবেক্ষণেও নদী ও বন্যা পরিস্থিতির real-time monitoring এবং flood early-warning ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। :contentReference[oaicite:0]{index=0}
সরকারি পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মূল ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর পানি বর্তমানে বিপজ্জনক প্রাথমিক ঢলের পর্যায়ে নেই।
তবে রাসুয়া ও নুওয়াকোটের ছোট নদী, পাহাড়ি ঝরনা এবং স্থানীয় জলধারায় আকস্মিকভাবে পানি বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে।
ভারী বৃষ্টি হলে দুর্বল হয়ে পড়া পাহাড়ি ঢালে নতুন ভূমিধস তৈরি হতে পারে এবং উদ্ধার অভিযান আবারও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
DHM-এর ১ সেপ্টেম্বরের আবহাওয়া তথ্যে কাঠমান্ডুসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনাও দেখানো হয়েছে এবং extreme weather ও flood information-এর জন্য early-warning service সচল রাখা হয়েছে। :contentReference[oaicite:1]{index=1}
চীন সীমান্তের Gyirongমুখী প্রধান সড়কের অবস্থাও এখনো কঠিন।
ধসে যাওয়া সড়ক পুনরুদ্ধার করতে চীনা দল কাজ করছে। সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় নদীর স্রোত শক্তিশালী এবং পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল থাকায় উদ্ধারকারী দলকে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।
উজানে নতুন ভূমিধস বা হিমবাহ-সংক্রান্ত ধসের কারণে নদীর প্রবাহ আটকে অস্থায়ী বাঁধ তৈরি হলে তা ভেঙে নতুন আকস্মিক ঢলের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে প্রথম বিপর্যয়ের মতো আরেকটি বিশাল ঢল নিশ্চিতভাবে আসছে—এমন কোনো সরকারি ঘোষণা নেই।
সব মিলিয়ে নেপালের বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত টানেল উদ্ধার অভিযান।
একদিকে মৃতের সরকারি সংখ্যা ১ হাজার ১০-এ পৌঁছেছে এবং ৪ হাজার ৫৯৯ জন এখনো নিখোঁজ; অন্যদিকে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর টানেলে আটকে বা নিখোঁজ শত শত মানুষের ভাগ্য এখনো অজানা।
নেপালি সেনাবাহিনী, Nepal Police, Armed Police Force Nepal এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল কাদা, পানি ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে টানেলের আরও গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
অনুসন্ধান ও তথ্য যাচাই অব্যাহত থাকায় মৃত, নিখোঁজ এবং উদ্ধার হওয়া মানুষের সরকারি হিসাব আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
সূত্র: Nepal Police, Nepali Army, National Disaster Risk Reduction and Management Authority (NDRRMA), Department of Hydrology and Meteorology (DHM), Government of Nepal এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ।
ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।






