নেপালে ১,৩৪৪ মরদেহ উদ্ধার, হাজারো নিখোঁজ—থামেনি টানেল অভিযান
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৬ পিএম
নেপাল–চীন সীমান্তবর্তী ভোটেকোশি নদীর ভয়াবহ ঢল ও ভূমিধসের প্রায় দুই সপ্তাহ পরও নিখোঁজ হাজারো মানুষের সন্ধান থামেনি। নেপাল সরকারের ৫ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ জাতীয় হিসাবে ১,৩৪৪টি মরদেহ বা দেহাবশেষ উদ্ধার এবং ১৩,০৯৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর শুধু রাসুয়া জেলাতেই ৩,০৭১ জন যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকার তথ্য দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। টানেল, ধ্বংসস্তূপ ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় অনুসন্ধান চলছে।

ভেরিক্সা নিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নেপাল–চীন সীমান্তবর্তী ভোটেকোশি নদীতে ভয়াবহ আকস্মিক ঢল ও ভূমিধসের প্রায় দুই সপ্তাহ পরও নিখোঁজ হাজারো মানুষের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
দুর্গম পাহাড়ি জনপদ, ধ্বংসস্তূপ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলগুলো এখন উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে।
নেপাল সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৫ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রকাশিত সর্বশেষ জাতীয় Situation Update অনুযায়ী, দুর্যোগকবলিত এলাকা থেকে ১,৩৪৪টি মরদেহ বা দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে।
একই সময় পর্যন্ত জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১৩,০৯৮ জনকে।
ওই জাতীয় হিসাবে তখনো প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০০ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যারা ৩৫টি দেশের।
সরকার জানিয়েছে, নিখোঁজদের তালিকা যাচাই এবং মরদেহ শনাক্তের কাজ চলমান থাকায় এসব সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
### শুধু রাসুয়াতেই যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ৩,০৭১ জন
৬ সেপ্টেম্বর রাসুয়া জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ স্থানীয় হিসাবে পরিস্থিতির আরও বিস্তারিত চিত্র পাওয়া গেছে।
সহকারী প্রধান জেলা কর্মকর্তা ধ্রুব প্রসাদ অধিকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাসুয়া জেলাতেই ৩,০৭১ জন এখনো যোগাযোগবিচ্ছিন্ন রয়েছেন।
তাদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ২৭ সদস্য, Nepal Police-এর ২৮ সদস্য এবং Armed Police Force Nepal-এর ১৩ সদস্য রয়েছেন।
এছাড়া ৭৯ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২৬ কর্মীর সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
রাসুয়ায় এ পর্যন্ত ১,৩১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে ১,২২৭ জন নেপালি এবং ৮৬ জন বিদেশি পর্যটক।
Gosainkund এলাকায় আটকে পড়া ১৪৫ জন তীর্থযাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দাকেও হেলিকপ্টারে উদ্ধার করে নুওয়াকোট ও কাঠমান্ডুর নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
যেসব এলাকায় সড়ক যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন, সেখানে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধারকাজ এবং জরুরি ত্রাণ সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
### সবচেয়ে কঠিন অভিযান টানেলগুলোতে
উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে জটিল অংশগুলোর একটি এখন ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল।
নেপালি সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষায়িত tunnel-rescue দল কাজ করছে।
Upper Trishuli-1, Upper Trishuli-3A, Upper Trishuli-3B, U216 Haku, Chilime এবং Langtang-সহ বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পে ড্রোন, ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম এবং বিশেষ কারিগরি দল ব্যবহার করা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার ১৫ সদস্যের Disaster Assistance Response Team (DART) এবং মালয়েশিয়ার ১১ সদস্যের Special Malaysia Disaster Assistance and Rescue Team (SMART) নেপালে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে।
### ধ্বংসস্তূপ থেকে মিলছে জীবিত মানুষও
দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পরও কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় অনুসন্ধানকারী দলগুলোর আশা আরও জোরালো হয়েছে।
নেপাল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, Upper Trishuli-3A টানেল থেকে দুই নেপালি কর্মীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
Upper Trishuli-1 প্রকল্প থেকে একজন চীনা নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
Betrawati এলাকায় ধসে পড়া একটি বাড়ির ভেতর থেকেও দীর্ঘ সময় পর একজন নেপালি নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
এ কারণে সম্ভাব্য বায়ু চলাচলের জায়গা, নিরাপদ চেম্বার এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে তৈরি হওয়া ফাঁকা অংশগুলোতে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
### Chilime-তে কাদা-পানি সরিয়ে গভীরে যাওয়ার চেষ্টা
Chilime জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে নেপাল ও ভারতের যৌথ দল কাজ করছে।
টানেলের ভেতরে জমে থাকা পানি, কাদা এবং ভারী ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে আরও ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চলছে।
ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম টানেলের কাছে পৌঁছানোর জন্য Syabrubesi থেকে একটি অস্থায়ী access road তৈরির কাজও চলছে।
### সড়ক-সেতু পুনঃসংযোগের চেষ্টা
দুর্যোগে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু পুনরুদ্ধারের কাজও চলছে।
নেপালি সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা Tadi নদীর ওপর অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করে Galchhi–Trishuli Road পুনরায় চালুর চেষ্টা করছেন।
Trishuli Indrenighat এবং Devighat এলাকায় দুটি cable pulley বা ‘tuen’ ইতোমধ্যে চালু করা হয়েছে, যাতে জরুরি নদী পারাপার ও যোগাযোগ বজায় রাখা যায়।
### রাসুয়ায় দেড় হাজার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত
প্রাথমিক হিসাবে শুধু রাসুয়া জেলাতেই প্রায় ১,৫০০ বাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রায় ৪১ কিলোমিটার সড়ক অচল হয়ে আছে।
একাধিক পাকা সেতু, Bailey bridge, truss bridge ও suspension bridge ধ্বংস অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলার আটটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
### আশ্রয়কেন্দ্রে ৭ হাজারের বেশি মানুষ
রাসুয়ায় ৭,০৩৩ বাস্তুচ্যুত মানুষকে ১২টি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাবার, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও পর্যায়ক্রমে পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের হিসাবে রাসুয়ার প্রায় ৮৩ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ আবার চালু হয়েছে।
Nepal Telecom-এর যোগাযোগ ব্যবস্থাও অনেক এলাকায় পুনঃস্থাপন করা হয়েছে।
### চীন সীমান্তে আটকে পড়াদের ফেরানো হচ্ছে
নেপাল–চীন সীমান্তে আটকে থাকা নেপালি নাগরিকদের দেশে ফেরানোর কাজও চলছে।
৫ সেপ্টেম্বরের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগের দিন ১৫৫ জন নেপালি Tatopani সীমান্ত দিয়ে দেশে ফিরেছেন।
আরও ১২৭ জনকে ফেরানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
Kerung ও আশপাশের এলাকায় থাকা নেপালিদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
### নতুন বড় ঢলের নিশ্চিত পূর্বাভাস নেই
নেপাল ও চীনের মধ্যে সীমান্তবর্তী নদীর পানিপ্রবাহ, আবহাওয়া এবং সম্ভাব্য ভূমিধস বা নতুন আকস্মিক ঢলের ঝুঁকি নিয়েও তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে।
নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই মুহূর্তে আরেকটি বড় আকস্মিক ঢল আসছে—এমন কোনো নিশ্চিত সরকারি তথ্য নেই।
তবে পাহাড়ি এলাকার অস্থিতিশীল ভূমি, নতুন বৃষ্টিপাত এবং নদীর প্রবাহের আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
এ কারণে দুর্গত এলাকার বাসিন্দা ও উদ্ধারকারী দলগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
### DNA দিয়ে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা
অশনাক্ত মরদেহ ও দেহাবশেষের পরিচয় নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মরদেহ থেকে DNA নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিকটাত্মীয়দের নমুনাও নেওয়া হচ্ছে।
নেপালি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের forensic এবং Disaster Victim Identification বিশেষজ্ঞরা এ কাজে যুক্ত রয়েছেন।
একদিকে হাজারো নিখোঁজ মানুষের সন্ধান, অন্যদিকে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়, চিকিৎসা, সড়ক-সেতু পুনঃসংযোগ ও জনপদ পুনর্বাসন—সব মিলিয়ে নেপালে উদ্ধার এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রম একই সঙ্গে চলছে।
দুর্যোগের প্রায় দুই সপ্তাহ পরও টানেল ও ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত মানুষ উদ্ধারের ঘটনা অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার আশা জাগিয়ে রেখেছে।
নেপাল সরকার জানিয়েছে, নিখোঁজদের তালিকা এবং হতাহত ও উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা নিয়মিত যাচাই করা হচ্ছে। নতুন তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি হিসাব হালনাগাদ করা হবে।
সূত্র: Government of Nepal—Ministry of Foreign Affairs; National Disaster Risk Reduction and Management Authority (NDRRMA); Rasuwa District Administration Office; Nepali Army; Nepal Police; Armed Police Force Nepal; Public Service Broadcasting Nepal/Radio Nepal (RSS)।
সর্বশেষ তথ্য হালনাগাদ: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।






