নেপালের ভোটেকোশি বন্যায় নিহত ৬২৬, নিখোঁজ ২,৪২৬; উদ্ধার ৪,৪৫১ জন
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম
নেপাল–চীন সীমান্তবর্তী রাসুয়া অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ২,৪২৬ জন, আর দুর্গত এলাকা থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৪,৪৫১ জনকে। নিখোঁজদের সন্ধানের পাশাপাশি নতুন আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও পর্যবেক্ষণ করছে কর্তৃপক্ষ।

ভেরিক্সা নিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশ: ৪:০৩ পিএম
নেপাল–চীন সীমান্তবর্তী রাসুয়া অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকার মধ্যেই মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
নেপালের National Disaster Risk Reduction and Management Authority (NDRRMA)-এর সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৬২৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। একই সঙ্গে ২ হাজার ৪২৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
এর আগের সরকারি হিসাবে ৫৭৯ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৯২৪ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য জানানো হয়েছিল। উদ্ধারকাজ এগিয়ে যাওয়া এবং নতুন তথ্য যাচাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই সংখ্যাই বেড়েছে।
নেপাল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগের পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৪৫১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নির্মাণাধীন একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়া ১৯১ জনও রয়েছেন। দুর্গতের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের নিরাপদে বের করে আনা হয়।
নেপালি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের স্থল ও আকাশপথের অভিযানে ২ হাজার ১০১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি ১ হাজার ৭০৬ জনকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন রয়েছেন। বিশেষ করে মাইলুং, টিমুরে ও স্যাফ্রুবেসিসহ দুর্গম এলাকায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে অভিযান চলছে।
দুর্যোগকবলিত অঞ্চলগুলোতে আকাশপথেও বড় ধরনের উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নেপালি সেনাবাহিনী ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে মোট ১৬টি হেলিকপ্টার উদ্ধার ও জরুরি পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ধুনচে, ত্রিশুলি, টিমুরে, স্যাফ্রুবেসি এবং আশপাশের দুর্গত এলাকায় অন্তত ৯৯টি উদ্ধার ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে বিভিন্ন সময়ে হেলিকপ্টার অভিযান বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বিদেশি নাগরিক ও পর্যটকদের সন্ধান, উদ্ধার এবং পরিচয় নিশ্চিত করতেও পৃথক সমন্বয় ব্যবস্থা চালু করেছে নেপাল সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১২৯ বিদেশি নাগরিক ও পর্যটককে উদ্ধার অথবা শনাক্ত করা হয়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশি নাগরিকদের পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য Emergency Control Room পরিচালনা করছে।
এর আগে ৩৩ দেশের শত শত বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তবে অনুসন্ধান, পরিচয় যাচাই এবং যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের কারণে বিদেশিদের নিখোঁজসংক্রান্ত তালিকা নিয়মিত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ কারণে আগের কোনো বিদেশি-নিখোঁজ সংখ্যাকে বর্তমান চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে ধরা হচ্ছে না।
এদিকে মূল বন্যার পানি কিছু এলাকায় কমতে শুরু করলেও নতুন করে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি।
নেপালের Flood Forecasting Division-এর তথ্য অনুযায়ী, ভোটেকোশি ও ত্রিশুলি নদীর পানি বর্তমানে সতর্কসীমার নিচে রয়েছে। তবে উজানে ভূমিধস ও ধ্বংসাবশেষের কারণে নদীর প্রবাহ আটকে তৈরি হওয়া অস্থায়ী হ্রদ নতুন ঝুঁকির কারণ হয়ে আছে।
স্যাটেলাইট চিত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একটি barrier lake বা অস্থায়ী হ্রদের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
অস্থায়ী বাঁধের কোনো অংশ ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি, পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে আবারও আকস্মিক বন্যা তৈরি করতে পারে।
এ কারণে ভোটেকোশির নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দা, যাত্রী এবং উদ্ধারকর্মীদের নদীর তীর ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সম্ভাব্য নতুন বন্যার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নেপাল সরকার দুই লাখের বেশি মানুষের মোবাইল ফোনে আগাম SMS সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে প্রয়োজন হলে দ্রুত উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে। নদীর উজানের পরিস্থিতিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
দুর্যোগের কারণ অনুসন্ধানে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণও চলছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বিশাল বরফ ও পাথরের ধস বা ice-rock avalanche-কে এই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার অন্যতম সম্ভাব্য তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, বিশাল বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে অস্থায়ী জলাধার তৈরি করে থাকতে পারে। পরে সেই বাধা ভেঙে পানি, বরফ, পাথর ও কাদা একসঙ্গে ভোটেকোশি নদী ব্যবস্থায় নেমে এসে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করে।
তবে বিজ্ঞানীরা এখনো ঘটনার পুরো ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করছেন। ফলে এই ব্যাখ্যাকে এখনই চূড়ান্ত কারণ হিসেবে নয়, সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া রাসুয়া জেলার সঙ্গে জাতীয় সড়ক যোগাযোগও ধীরে ধীরে পুনঃস্থাপন করা হচ্ছে।
Bogatitar–Kalikasthan–Dhunche রুট চালু করা হয়েছে। Kathmandu–Mugling সড়কের এক পাশ দিয়েও যান চলাচল শুরু হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত সেতুগুলো দ্রুত প্রতিস্থাপনের জন্য ভারত ও চীনের কাছ থেকে ৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের মোট ১০টি Bailey bridge সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে নেপাল সরকার।
বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাও পর্যায়ক্রমে সচল করা হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ১২০টি Nepal Telecom সাইটের মধ্যে ৮২টি এবং ৭৮টি Ncell সাইটের মধ্যে ৬৩টি পুনরায় চালু হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত মোট ১৯৮টি টেলিকম সাইটের মধ্যে ১৪৫টি আবার সচল করা সম্ভব হয়েছে।
নুওয়াকোটের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনঃস্থাপন করা হয়েছে বলেও সরকারি তথ্যে জানানো হয়েছে।
জরুরি উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৫টি স্থানীয় সরকারকে ৬ কোটি ৭৫ লাখ নেপালি রুপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, টেলিযোগাযোগ এবং জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে ১৫টি কারিগরি দল মাঠপর্যায়ে কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে মাত্র ৩৬ ঘণ্টায় ১৯০ কোটির বেশি নেপালি রুপি জমা পড়েছে বলেও সরকার জানিয়েছে।
দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠন ও অবকাঠামো পুনরুদ্ধারেও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে আনুমানিক ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
নেপাল সরকার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে বিশেষ করে টানেল উদ্ধার, DNA-এর মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের মতো কারিগরি ক্ষেত্রে সহযোগিতা চাইছে।
সীমান্তের অপর পাশে চীনের তিব্বত অঞ্চলেও এই দুর্যোগে প্রাণহানি হয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে সেখানে সাতজনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ৫৫৪ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সীমান্তের কাছে তৈরি একটি অস্থায়ী হ্রদের পানি ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে হ্রদটি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কিছুটা কমেছে।
তবে হিমবাহের গোড়ার দিকে আরও একটি বড় জলাধার শনাক্ত হওয়ায় ওই এলাকার পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
বর্তমানে নেপালের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ২ হাজার ৪২৬ নিখোঁজ মানুষের সন্ধান পাওয়া, দুর্গম এলাকায় অনুসন্ধান অভিযান চালিয়ে যাওয়া, বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং নতুন কোনো আকস্মিক ঢল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী ও উদ্ধারকর্মীদের নিরাপদ রাখা।
সর্বশেষ সরকারি হিসাবে নেপালে ৬২৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, ২ হাজার ৪২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন এবং ৪ হাজার ৪৫১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। অনুসন্ধান, উদ্ধার, চিকিৎসা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: National Disaster Risk Reduction and Management Authority (NDRRMA), Government of Nepal এবং সংশ্লিষ্ট নেপালি সরকারি সংস্থা; চীনের সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ।
ফটো গ্যালারি

ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।






