নেপালে ভোটেকোশি বিপর্যয়ে মৃত্যু বেড়ে ৯০৩, নিখোঁজ ৪,৩৪৭; জীবিত উদ্ধার ১০,৪৫৯
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৯ পিএম
নেপালের ভোটেকোশি আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯০৩ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো ৪,৩৪৭ জন নিখোঁজ বা তাদের অবস্থান নিশ্চিত নয়। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১০,৪৫৯ জনকে। টানেল উদ্ধার, মরদেহ শনাক্তকরণ ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি নতুন বৃষ্টি, ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকিও পর্যবেক্ষণ করছে সরকার।

ভেরিক্সা নিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
নেপাল–চীন সীমান্তবর্তী রাসুয়া অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ ভোটেকোশি আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর উদ্ধার অভিযান যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই বাড়ছে মানবিক ক্ষয়ক্ষতির সরকারি হিসাব।
নেপালের National Disaster Risk Reduction and Management Authority (NDRRMA)-এর সর্বশেষ সমন্বিত তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৯০৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে।
এখনো ৪ হাজার ৩৪৭ জন নিখোঁজ অথবা তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
দুর্যোগে আহত হয়েছেন ২৬৭ জন। বন্যা, ভূমিধস ও ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া এলাকা থেকে মোট ১০ হাজার ৪৫৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
নেপাল পুলিশ, নেপালি সেনাবাহিনী এবং Armed Police Force-সহ ২০ হাজার ৮০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছেন।
নিখোঁজ মানুষের সন্ধানে অভিযান এখনো পুরোদমে চলছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বন্যা ও ধ্বংসাবশেষে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলগুলোতে।
কাদা, পানি ও ধ্বংসস্তূপে বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব টানেলে আটকে থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছাতে নেপালি সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিশেষায়িত কারিগরি দল কাজ করছে।
নেপালি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হেলিকপ্টারের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৪৪ নেপালি নাগরিক এবং ২৫২ বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে।
আকাশপথের উদ্ধার কার্যক্রমে মোট ৪১১টি হেলিকপ্টার sortie পরিচালনা করা হয়েছে।
বিদেশি নাগরিক ও পর্যটকদের জন্য আলাদা সমন্বয় ব্যবস্থাও চালু রেখেছে নেপাল সরকার।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের Emergency Control Room নিখোঁজ বিদেশিদের অবস্থান শনাক্ত করা, উদ্ধার, পরিচয় যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের কাজ করছে।
৩০ আগস্টের সরকারি ব্রিফিংয়ে সামগ্রিক উদ্ধার হিসাবে ২৬১ জনের বেশি বিদেশি নাগরিককে উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল এবং তখনো ৪০০-এর বেশি বিদেশি নিখোঁজ ছিলেন।
এদিকে সেনাবাহিনীর সর্বশেষ ২৫২ বিদেশি উদ্ধারের হিসাবটি শুধু হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পরিচালিত নির্দিষ্ট উদ্ধার কার্যক্রমের। ফলে দুটি হিসাবের সময়সীমা ও গণনার ধরন আলাদা।
সরকার জানিয়েছে, অনুসন্ধান ও পরিচয় যাচাই চলমান থাকায় বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যাও নিয়মিত পরিবর্তিত হচ্ছে।
টানেলে আটকে পড়াদের উদ্ধারে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে।
নেপাল সরকারের সমন্বয়ে ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষায়িত tunnel-rescue এবং কারিগরি দল অভিযানে যুক্ত হয়েছে।
ভারত থেকে ১১ সদস্যের এবং চীন থেকে ৯ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল নেপালি বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরাও উদ্ধার কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন।
এসব দল মূলত কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষে বন্ধ হয়ে যাওয়া টানেল এবং জটিল অবকাঠামোর ভেতরে আটকে থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছাতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধারের কারণে শনাক্তকরণ ও মরদেহ ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপাল সরকার মরদেহ সংরক্ষণের জন্য airtight body bag সংগ্রহ করেছে এবং আরও সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে।
DNA বিশ্লেষণ ও ফরেনসিক শনাক্তকরণে সহায়তার জন্য ভারত থেকে ১৮ সদস্যের একটি বিশেষ forensic team নেপালে পৌঁছেছে।
দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে যেসব মরদেহ পচে গেছে, বিকৃত হয়েছে বা দৃশ্যত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না, সেগুলো থেকে DNA নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সরকার জানিয়েছে, অশনাক্ত বা পচনধরা মরদেহের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ICRC protocol অনুসরণ করা হচ্ছে।
DNA নমুনা সংগ্রহের পর প্রয়োজন অনুযায়ী মরদেহ সাময়িকভাবে দাফন করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে পরিচয় নিশ্চিত হলে পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্যের সুযোগ রাখা হচ্ছে।
দুর্গত এলাকাগুলোতে সরকারি মেডিকেল ও emergency response team-ও কাজ করছে।
ত্রাণ কার্যক্রমের আওতায় জরুরি চিকিৎসা, খাবার, নিরাপদ পানীয় জল, অস্থায়ী আশ্রয়, ওষুধ, স্বাস্থ্যসামগ্রী এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হচ্ছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে সরাসরি আর্থিক সহায়তাও দিয়েছে নেপাল সরকার।
রাসুয়া ও নুওয়াকোট জেলাকে জরুরি ত্রাণ ও স্থানীয় ব্যবস্থাপনার জন্য এক কোটি নেপালি রুপি করে দেওয়া হয়েছে।
ধাদিং জেলাকে দেওয়া হয়েছে ৫০ লাখ নেপালি রুপি।
এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ১৫টি স্থানীয় সরকারকে মোট ৬ কোটি ৭৫ লাখ নেপালি রুপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
উদ্ধার ও ত্রাণের পাশাপাশি সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা বন্যার ঝুঁকিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্ষা মৌসুম এবং নতুন বৃষ্টির সম্ভাবনার কারণে নদী ব্যবস্থা ও downstream flood risk-এর ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে।
সম্ভাব্য অতিরিক্ত বন্যার ঝুঁকির জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যবস্থা high alert-এ রয়েছে।
Department of Hydrology and Meteorology (DHM) ৩১ আগস্টও বৃষ্টিপাত ও নদীর পানির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
সর্বশেষ সরকারি পর্যবেক্ষণে গত ২৪ ঘণ্টায় Melamchi-Ghyang এলাকায় সর্বোচ্চ প্রায় ৮৯ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।
DHM সতর্ক করেছে, স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে খাড়া ও দুর্বল পাহাড়ি ঢালে নতুন ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় নদী ও জলপ্রবাহে হঠাৎ পানি বেড়ে যেতে পারে।
৩১ আগস্টের সরকারি আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, কাঠমান্ডুতে বৃষ্টির সম্ভাবনা প্রায় ৬০ শতাংশ।
দেশের আরও কয়েকটি অঞ্চলে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
দুর্যোগকবলিত পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টি হলে উদ্ধার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়া, নতুন ভূমিধস এবং নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে সরকার।
এদিকে ভোটেকোশি বিপর্যয়ের চূড়ান্ত কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করেনি নেপাল সরকার।
২৯ আগস্ট নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ২৬ আগস্ট ভোটেকোশিতে তৈরি হওয়া ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত নয়।
হিমবাহ ধস, landslide-dammed lake বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে ঘিরে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকলেও সরকারি তদন্ত ও মূল্যায়ন শেষ হওয়ার আগে কোনো একটি কারণকে চূড়ান্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।
বর্তমান সরকারি হিসাবে নেপালে মৃতের সংখ্যা ৯০৩ এবং নিখোঁজ বা অবস্থান অজানা মানুষের সংখ্যা ৪ হাজার ৩৪৭।
আহত হয়েছেন ২৬৭ জন এবং জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১০ হাজার ৪৫৯ জনকে।
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়া।
একই সঙ্গে টানেল ও ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধার, বিদেশি নাগরিকদের শনাক্তকরণ, DNA পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করা, আহত ও দুর্গতদের চিকিৎসা ও ত্রাণ দেওয়া এবং নতুন বৃষ্টি, ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
অনুসন্ধান, উদ্ধার ও তথ্য যাচাই চলমান থাকায় মৃত, নিখোঁজ ও উদ্ধার হওয়া মানুষের সরকারি হিসাব আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
সূত্র: National Disaster Risk Reduction and Management Authority (NDRRMA), Nepali Army, Ministry of Foreign Affairs, Department of Hydrology and Meteorology (DHM) এবং নেপাল সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ফটো গ্যালারি

ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।






