নেপালের ভোটেকোশি বিপর্যয়ে নিহত ৬৭৫, নিখোঁজ ২,৪২৬; নতুন বন্যার ঝুঁকিতে চলছে উদ্ধার
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩১ পিএম
নেপালের ভোটেকোশি নদী থেকে নেমে আসা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৭৫ জনে পৌঁছেছে। এখনো ২,৪২৬ জনের অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চলার পাশাপাশি নতুন বৃষ্টি, ভূমিধস ও উজানের অস্থায়ী হ্রদ থেকে আরেক দফা আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও পর্যবেক্ষণ করছে কর্তৃপক্ষ।

ভেরিক্সা নিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশ: ১১:২১ পিএম
নেপালের ভোটেকোশি নদী থেকে ত্রিশুলি অববাহিকায় নেমে আসা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে বিপর্যয়ের ভয়াবহতা। দেশটির সর্বশেষ সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ৬৭৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ২ হাজার ৪২৬ জনের অবস্থান এখনো জানা যায়নি।
নেপালের National Disaster Risk Reduction and Management Authority (NDRRMA)-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ভেসে যাওয়া মানুষদের মরদেহ রাসুয়া থেকে শুরু করে আরও নিচের বিভিন্ন জেলায় উদ্ধার করা হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, রাসুয়ায় ১৩টি, ধাদিংয়ে ৪৫টি, নুওয়াকোটে ৫১টি, গোরখায় ৫৭টি, তানাহুনে ৩৫টি, চিতওয়ানে ২৪৬টি, নাওয়ালপরাসি পূর্বে ১৬৫টি এবং নাওয়ালপরাসি পশ্চিমে ৬৩টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।
সব মিলিয়ে এই আট জেলায় উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ৬৭৫।
নিখোঁজদের সন্ধানেও বড় পরিসরে অভিযান চলছে। সর্বশেষ সরকারি হিসাবে ২ হাজার ৪২৬ জন এখনো নিখোঁজ অথবা তাদের বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি।
নিখোঁজদের তালিকায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন। সরকারি তথ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৪ জন, নেপাল পুলিশের ২৭ জন এবং Armed Police Force-এর ১৩ সদস্যের অবস্থান এখনো নিশ্চিত না হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, উদ্ধার, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য যাচাইয়ের সঙ্গে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে। এ কারণে অনুমাননির্ভর সংখ্যা প্রচার না করে সরকারি হালনাগাদ অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নেপাল পুলিশের সর্বশেষ অপারেশনাল হিসাবে বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ২ হাজার ৩০১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এর মধ্যে রাসুয়া থেকে ৬৭৬, নুওয়াকোট থেকে ১ হাজার ৬২২ এবং ধাদিং থেকে তিনজনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
গুরুতর আহতদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাঠমান্ডুতে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসা শেষে অন্তত ১৪০ জন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন বলে সরকারি তথ্যে জানানো হয়েছে।
তবে দুর্যোগের শুরু থেকে বিভিন্ন বাহিনী ও সরকারি সংস্থার সম্মিলিত পূর্ববর্তী হিসাবে ৪ হাজার ৪৫০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধারের তথ্য দেওয়া হয়েছিল। পুলিশি অপারেশনাল হিসাব এবং সামগ্রিক সরকারি হিসাবের সময়সীমা ও গণনার ধরন আলাদা হওয়ায় দুটি সংখ্যা পৃথকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বন্যার পর সবচেয়ে কঠিন উদ্ধার অভিযানগুলোর একটি চলছে ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও টানেল এলাকায়।
নেপাল সরকারের অনুরোধে ভারত থেকে ১১ সদস্যের একটি বিশেষায়িত technical reconnaissance team টানেল উদ্ধার অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছে। চীনের একটি বিশেষায়িত টানেল উদ্ধারকারী দলকেও অভিযানে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ দলগুলো এমন টানেল ও ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান চালাবে, যেখানে এখনো মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ধ্বংসস্তূপ বা বন্ধ টানেলের ভেতরে জীবিত ব্যক্তির অবস্থান শনাক্তে বিশেষ প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছে নেপাল।
বিদেশি নাগরিক ও পর্যটকদের নিয়েও আলাদা সমন্বয় কার্যক্রম চলছে।
নেপাল সরকারের সামগ্রিক পূর্ববর্তী উদ্ধার তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া মানুষের মধ্যে ১৮৭ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
বিদেশিদের সন্ধান, পরিচয় নিশ্চিত করা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজন হলে কনস্যুলার সহায়তা সমন্বয়ের জন্য নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় Emergency Response Team চালু রেখেছে।
বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পরিচয় যাচাই ও যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের সঙ্গে বিদেশি নাগরিকদের তথ্যও নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে।
এদিকে বন্যার মূল স্রোত কমলেও নতুন বিপদের আশঙ্কা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
ভোটেকোশি এবং এর নিম্ন অববাহিকার নদীগুলোতে পানি প্রবাহ ও downstream flood risk নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে নেপালের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো।
পাহাড়ধস, বরফ, পাথর ও বিপুল ধ্বংসাবশেষে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে উজানে অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হওয়ার কারণে নতুন করে পানি নেমে আসার ঝুঁকি রয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে প্রয়োজনে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে। সম্ভাব্য বিপদের আগাম সতর্কতা হিসেবে দুই লাখের বেশি মানুষের মোবাইল ফোনে SMS পাঠানোর তথ্যও জানিয়েছে সরকার।
নতুন বৃষ্টিও উদ্ধার তৎপরতার জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
নেপালের Department of Hydrology and Meteorology (DHM) শনিবারও সতর্কতা কার্যকর রেখেছে এবং বৃষ্টিপাত ও নদীর প্রবাহের real-time monitoring চালিয়ে যাচ্ছে।
বন্যাকবলিত ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি এলাকায় নতুন করে বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু উচ্চভূমিতে তুষারপাতের আশঙ্কাও রয়েছে।
পাহাড়ি এলাকায় নতুন বৃষ্টি হলে ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়া ঢালে আবার ভূমিধস হতে পারে। নদীর পানি বাড়ার পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকারী দলের চলাচলও এতে কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এর আগেও কয়েক দফায় উদ্ধার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে নিখোঁজদের সন্ধানে স্থল ও অন্যান্য উপযোগী পথে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ভোটেকোশি বিপর্যয়ের চূড়ান্ত কারণ নিয়েও এখনো তদন্ত শেষ হয়নি।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনিবার জানিয়েছে, ২৬ আগস্টের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার কারণ এখনো পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায়নি।
প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে বিশাল বরফ ও পাথরের ধস বা ice-rock avalanche-এর পর বিপুল ধ্বংসাবশেষ নদী ব্যবস্থায় নেমে আসা এবং নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়ার ঘটনাকে সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, নদীর প্রবাহ আটকে পানি জমে অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হওয়ার পর কোনো পর্যায়ে বাধাটি ভেঙে বিপুল পানি, বরফ, পাথর ও কাদা একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা তৈরি করে থাকতে পারে।
তবে সরকারি ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত কারণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।
দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তাও গ্রহণ করছে নেপাল।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে ইতোমধ্যে ৫৭ টনের বেশি জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেছে। পাশাপাশি চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন অংশীদারের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও সহায়তা আসছে।
নেপাল সরকার জানিয়েছে, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি পরবর্তী পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন পর্যায়েও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক যোগাযোগও ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
রাসুয়ার সঙ্গে জাতীয় সড়ক যোগাযোগ পুনঃস্থাপনে Bogatitar–Kalikasthan–Dhunche রুট পুনরায় চালু করা হয়েছে। Kathmandu–Mugling সড়কের এক দিক দিয়েও যান চলাচল শুরু হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত সেতুর দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করতে ভারত ও চীন থেকে ৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের ১০টি Bailey bridge সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধারের কাজও এগোচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ১২০টি Nepal Telecom সাইটের মধ্যে ৮২টি এবং ৭৮টি Ncell সাইটের মধ্যে ৬৩টি আবার সচল হয়েছে।
সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ১৯৮টি টেলিযোগাযোগ সাইটের মধ্যে ১৪৫টি পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে।
নুওয়াকোটের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও ফিরেছে।
রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, টেলিযোগাযোগ ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব নির্ধারণে ১৫টি কারিগরি দল মাঠে কাজ করছে।
জরুরি উদ্ধার, ত্রাণ ও তাৎক্ষণিক পুনর্বাসন কার্যক্রমের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ১৫টি স্থানীয় সরকারকে ৬ কোটি ৭৫ লাখ নেপালি রুপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর Disaster Relief Fund-এ মাত্র ৩৬ ঘণ্টায় ১৯০ কোটির বেশি নেপালি রুপি জমা হওয়ার তথ্যও জানিয়েছে সরকার।
বর্তমানে নেপালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ২ হাজার ৪২৬ নিখোঁজ মানুষের সন্ধান পাওয়া।
একই সঙ্গে টানেল ও ধ্বংসস্তূপে সম্ভাব্য আটকে পড়া মানুষদের খুঁজে বের করা, বিদেশিদের পরিচয় নিশ্চিত করা, আহতদের চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খাদ্য-পানি ও আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি সচল করার কাজ চলছে।
এর পাশাপাশি নতুন বৃষ্টি, ভূমিধস এবং উজানের অস্থায়ী হ্রদ থেকে আরেক দফা আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনা সামনে রেখে পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে নেপাল সরকার।
সর্বশেষ সরকারি হিসাবে নেপালে ৬৭৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ২ হাজার ৪২৬ জনের অবস্থান এখনো জানা যায়নি। অনুসন্ধান, উদ্ধার, চিকিৎসা, ত্রাণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: National Disaster Risk Reduction and Management Authority (NDRRMA), Nepal Police, Ministry of Foreign Affairs এবং Department of Hydrology and Meteorology (DHM), Government of Nepal.
ফটো গ্যালারি

ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।






