নেপালের ভোটেকোশি বিপর্যয়ে ৭৩৪ মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজ ২,৪৯৮; ফের বাড়ছে নদীর পানি
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০১:১১ পিএম
নেপাল–চীন সীমান্ত থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ ঢল ও ভূমিধসের পর নেপালে উদ্ধার হওয়া মরদেহ ও দেহাবশেষের সংখ্যা বেড়ে ৭৩৪-এ পৌঁছেছে। এখনো ২,৪৯৮ জন নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এবং জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৮,১৮৬ জনকে। একই সময়ে ভোটেকোশি ও ত্রিশুলি নদীতে নতুন করে পানি বাড়ায় দ্বিতীয় দফা বন্যার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক রয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ভেরিক্সা নিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশ: ১:০২ পিএম
নেপাল–চীন সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে নেমে আসা ভয়াবহ আকস্মিক ঢল ও ভূমিধসের পর চার দিন পেরোলেও পরিস্থিতি এখনো সংকটজনক। অনুসন্ধান যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই বাড়ছে উদ্ধার হওয়া মরদেহ ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা।
৩০ আগস্ট দুপুর ১২টা পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নেপালে এখন পর্যন্ত ৭৩৪ জনের মরদেহ বা দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২ হাজার ৪৯৮ জন এখনো নিখোঁজ অথবা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। আহত হয়েছেন অন্তত ২৪২ জন।
নেপালের National Disaster Risk Reduction and Management Authority (NDRRMA)-এর সকাল ৯টার সমন্বিত হিসাবে, দুর্যোগকবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত ৮ হাজার ১৮৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
অনুসন্ধান, উদ্ধার, নিরাপত্তা ও ত্রাণ কার্যক্রমে নেপালি সেনাবাহিনী, নেপাল পুলিশ ও Armed Police Force-সহ মোট ১৯ হাজার ৮৯৫ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন রয়েছেন।
সবচেয়ে জটিল উদ্ধার পরিস্থিতিগুলোর একটি তৈরি হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও টানেল এলাকায়।
সরকারি হিসাবে নিখোঁজদের মধ্যে ৯৩৩ জন বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। টানেল ও দুর্গম অবকাঠামোর ভেতরে কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত অনুসন্ধান চলছে।
গত দুই দিনে টানেলসংলগ্ন এলাকা থেকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ২৭৯ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২২৭ বিদেশি নাগরিককেও আকাশপথে উদ্ধার করা হয়েছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া বিদেশিদের সঙ্গে ভ্রমণকারী ১২৭ নেপালি নাগরিকের অবস্থানও এখনো নিশ্চিত হয়নি।
নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৮৫ সদস্যও নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন।
দুর্যোগের প্রবল স্রোত কতটা বিস্তৃত এলাকা প্রভাবিত করেছে, তা মরদেহ উদ্ধারের জেলা-ভিত্তিক হিসাবেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বেশি ২৫৯টি মরদেহ বা দেহাবশেষ উদ্ধার হয়েছে চিতওয়ানে। নাওয়ালপরাসি ইস্টে পাওয়া গেছে ১৮৪টি এবং নাওয়ালপরাসি ওয়েস্টে ৮২টি।
এছাড়া গোরখায় ৫৮, নুয়াকোটে ৫২, ধাদিংয়ে ৫০, তানাহুনে ৩৬ এবং উৎসস্থলের কাছাকাছি রাসুয়ায় ১৩টি মরদেহ বা দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভয়াবহ স্রোতে অনেক মরদেহ মূল দুর্যোগস্থল থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ভেসে গেছে। এ কারণেই ভোটেকোশি থেকে ত্রিশুলি হয়ে আরও নিচের নদীবিধৌত এলাকায় অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।
এদিকে রোববার সকাল থেকে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে নদীর পানি বৃদ্ধি।
চীনের উজান অংশে পানিপ্রবাহ বাড়ার তথ্য নেপালকে জানানোর পর ভোটেকোশি নদীতে পানি বাড়তে শুরু করে। এর পর বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দা ও উদ্ধারকারী দলগুলোকে আবারও সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
ত্রিশুলি নদীতেও পানি বেড়েছে। নতুন বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা প্রবাহের কারণে কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা এবং উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হয়েছে।
নেপালের Department of Hydrology and Meteorology (DHM) ৩০ আগস্টও বৃষ্টিপাত, নদীর পানি ও সম্ভাব্য বন্যার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। rainfall ও river alert ব্যবস্থা এবং flood early-warning কার্যক্রম সক্রিয় রয়েছে।
নেপালের পাশাপাশি সীমান্তের অপর পাশে চীনের তিব্বত অঞ্চলেও দুর্যোগের ভয়াবহতা বেড়েছে।
তিব্বতের Gyirong County এলাকায় সর্বশেষ সরকারি হিসাবে ১৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ৫৪৬ জন এখনো নিখোঁজ।
নেপাল ও তিব্বতের সরকারি হিসাব একত্র করলে ৩০ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত দুই পাশে অন্তত ৭৫০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজ বা অবস্থান অজানা রয়েছে মোট ৩ হাজার ৪৪ জন।
চীনের তিব্বত অংশে নিখোঁজদের মধ্যে ২৩টি দেশের ২৬১ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৪ জন নেপালি এবং ৪৯ জন ভারতীয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ আরও বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন।
চীনের পক্ষ থেকে সীমান্তবর্তী দুর্গত এলাকায় দুই হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। ড্রোন, জীবন শনাক্তকারী যন্ত্র এবং অন্যান্য বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিখোঁজদের সন্ধান চালানো হচ্ছে।
নেপালের জটিল টানেল উদ্ধার কার্যক্রমেও ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞ দল প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।
সীমান্তের উজানে তৈরি হওয়া অস্থায়ী হ্রদগুলোও নতুন করে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে।
আগে তৈরি একটি বড় barrier lake শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে অনেকটাই স্বাভাবিকভাবে পানি নিষ্কাশন করেছিল। এতে ওই হ্রদের তাৎক্ষণিক বিপদের মাত্রা কিছুটা কমে।
তবে ড্রোন পর্যবেক্ষণে ওই স্থান থেকে প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার নিচে নতুন একটি ভূমিধস শনাক্ত হয়েছে। ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষ নদীর প্রবাহ আটকে নতুন বাঁধ ও জলাধার তৈরি করেছে।
নতুন এই জলাধারের কারণে দ্বিতীয় দফা বড় ঢলের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় Gyirong সীমান্তের কাছাকাছি থাকা কয়েকটি উদ্ধারকারী দলকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নেপাল সরকার জানিয়েছে, সাধারণ অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা দেশটির রয়েছে। তবে কিছু বিশেষায়িত অভিযানে বিদেশি কারিগরি সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে টানেলের গভীরে আটকে থাকা জীবিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার প্রযুক্তি, দ্রুত DNA পরীক্ষা, ফরেনসিক পরিচয় নির্ধারণ এবং বিপুলসংখ্যক মরদেহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে খাদ্য ও জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজও চলছে।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে ৩৭টি ট্রাক দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বা কঠিন এমন এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
রাসুয়া, নুয়াকোটসহ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সরকারি আর্থিক সহায়তা বিতরণও শুরু হয়েছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ২ হাজার ৪৯৮ নিখোঁজ মানুষের অবস্থান শনাক্ত করা এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও টানেল এলাকায় আটকে থাকার আশঙ্কা থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছানো।
একই সঙ্গে বিদেশি নাগরিকদের শনাক্তকরণ, আহতদের চিকিৎসা, দুর্গত মানুষকে খাদ্য ও আশ্রয় দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।
তবে উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি নতুন করে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে ভোটেকোশি ও ত্রিশুলি নদীর পানি বৃদ্ধি।
নতুন বৃষ্টি, উজানের অতিরিক্ত পানিপ্রবাহ এবং ভূমিধসে তৈরি নতুন অস্থায়ী জলাধারের কারণে দ্বিতীয় দফা বড় আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
সর্বশেষ সরকারি হিসাবে নেপালে ৭৩৪ জনের মরদেহ বা দেহাবশেষ উদ্ধার হয়েছে, ২ হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এবং ৮ হাজার ১৮৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
অনুসন্ধান, উদ্ধার, ত্রাণ এবং নদী ও পাহাড়ি এলাকার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রেখেছে নেপাল সরকার।
সূত্র: National Disaster Risk Reduction and Management Authority (NDRRMA), Department of Hydrology and Meteorology (DHM) এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, Government of Nepal; সংশ্লিষ্ট চীনা সরকারি কর্তৃপক্ষ।
ফটো গ্যালারি

ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।






