নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, নিহত ২২; নিখোঁজ প্রায় ৪০০
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম
নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২৯১ বিদেশিসহ ৩৮৪ পর্যটক ও যাত্রী যোগাযোগবিচ্ছিন্ন রয়েছেন। বন্যায় রাসুয়া ও নুয়াকোটের বহু বসতি, সড়ক, সেতু, বাজার, নিরাপত্তা পোস্ট এবং জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে নেপাল সরকার।
ভেরিক্সা নিউজ আন্তর্জাতিক
বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশ: ৮:৩৩ পিএম
নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন রয়েছেন শত শত মানুষ। বুধবার সকালে রাসুয়া জেলার ভোটেকোশি নদীতে হঠাৎ প্রবল পানির ঢল নেমে আসার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়।
নেপালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৩৮৪ পর্যটক ও যাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি নাগরিক।
নিখোঁজদের মধ্যে নেপালের পাশাপাশি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, যোগাযোগবিচ্ছিন্নদের বড় একটি অংশ কৈলাস-মানসসরোবরগামী পর্যটক ও তীর্থযাত্রী।
বন্যায় রাসুয়ার টিমুরে, রাসুয়াগড়ি ও স্যাফ্রুবেসি এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রবল স্রোতে বাড়িঘর, দোকানপাট, বাজার, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে গেছে বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভোটেকোশি থেকে নেমে আসা পানির প্রবল ঢল পরে ত্রিশুলি নদীতেও ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাবে নুয়াকোটের বেত্রাবতী, ত্রিশুলি বাজার, ধুঙ্গে ও দেবীঘাটসহ নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ত্রিশুলি বাজারের আশপাশেই প্রায় ৬০টি বাড়ি ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বন্যায় রাসুয়ায় কয়েকটি পুলিশ পোস্টও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর বহু সদস্যও প্রথম দিকে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ছিলেন।
নেপালি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ৮৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার তৎপরতায় সেনাবাহিনী, আর্মড পুলিশ ফোর্স এবং নেপাল পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে।
প্রতিকূল আবহাওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় সড়কপথে পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের।
নেপাল সরকার সেনাবাহিনী ও বেসরকারি হেলিকপ্টার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছে। আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
বুধবার জরুরি মন্ত্রিসভা বৈঠকে বন্যাকবলিত স্থানীয় এলাকাগুলোকে তিন মাসের জন্য দুর্যোগ-সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেয় নেপাল সরকার।
রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিংয়ে তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকার জরুরি অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থাও করেছে।
পাশাপাশি রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, গোরখা ও চিতওয়ানের নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ভোটেকোশি, ত্রিশুলি ও নারায়ণী নদীর ভাটির অংশে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।
বন্যার কারণ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষকদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বরফ ও পাথরের বড় ধরনের ধস লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে একটি অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করে থাকতে পারে। পরে সেই বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি হঠাৎ নিচে নেমে আসায় এই আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হতে পারে।
একই সময় তিব্বত অঞ্চলে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পও রেকর্ড করা হয়েছে। তবে ভূমিকম্প, বরফধস এবং সম্ভাব্য হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক এখনো তদন্তাধীন।
নেপালের আবহাওয়া ও জলবিদ্যা বিভাগ জানিয়েছে, রাসুয়া এলাকায় মঙ্গলবার ও বুধবার উল্লেখযোগ্য ভারী বৃষ্টিপাত হয়নি। এ কারণে স্বাভাবিক বর্ষাজনিত বন্যার চেয়ে হঠাৎ ওপর থেকে বিপুল পানি নেমে আসার ঘটনাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বন্যায় নেপালের বিদ্যুৎ খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা বন্ধ হয়ে গেছে বলে দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
অন্তত ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাও অচল হয়ে পড়েছে।
রাসুয়া অঞ্চলের একটি নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রায় ৬০ কর্মীও প্রথম দিকে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
বন্যায় সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় কাঠমান্ডু থেকে রাসুয়া, নুয়াকোট, চিতওয়ান ও ধাদিংগামী যানবাহন চলাচলেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিমানভাড়া না বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে এয়ারলাইন্সগুলোকে।
অন্যদিকে চীনের তিব্বত অংশেও একই দুর্যোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। চীনা কর্তৃপক্ষ উদ্ধার অভিযানে শত শত উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের সন্ধান, আহতদের চিকিৎসা এবং প্রাণহানি কমাতে সর্বাত্মক উদ্ধার অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ভারত, চীন ও বিশ্বব্যাংকও নেপালের দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছে বলে নেপালি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বন্যাকবলিত পাঁচ জেলার আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করেছেন।
দেশটির পার্লামেন্টেও বুধবারের অধিবেশনে রাসুয়া বন্যা প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। বিভিন্ন দলের আইনপ্রণেতারা দ্রুত উদ্ধার, ত্রাণ, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানান।
সন্ধ্যা পর্যন্ত হতাহত ও নিখোঁজের চূড়ান্ত সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। যোগাযোগবিচ্ছিন্ন বহু এলাকায় উদ্ধারকারী দল এখনো পৌঁছাতে না পারায় প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে উজানে নতুন করে পানির প্রবাহ আটকে থাকার আশঙ্কায় দ্বিতীয় দফা আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও পর্যবেক্ষণ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ফটো গ্যালারি

ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।






