পচে যাচ্ছে মরদেহ, শনাক্ত করাও কঠিন—ডিএনএ নিয়ে অস্থায়ী দাফন নেপালে
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৫ এএম
ভোটেকোশি বিপর্যয়ে বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধারের পর নেপালে শনাক্তকরণ ও সংরক্ষণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকায় অনেক মরদেহ পচে যাওয়ায় পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি অশনাক্ত মরদেহ থেকে DNA নমুনা সংগ্রহের পর সরকারি প্রটোকল অনুসরণ করে সাময়িকভাবে দাফন করা হচ্ছে।

ভেরিক্সা নিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নেপালের ভয়াবহ ভোটেকোশি বন্যা ও ভূমিধসের পর প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে নতুন নতুন মরদেহ। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মৃতদেহ একসঙ্গে সামলানো, সংরক্ষণ করা এবং পরিচয় নিশ্চিত করা এখন দেশটির সামনে বড় মানবিক ও ফরেনসিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে দীর্ঘ সময় নদী, কাদা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে থাকা অনেক মরদেহ পচে গেছে বা এতটাই বিকৃত হয়েছে যে স্বাভাবিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে, দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে যেসব মরদেহ শনাক্ত করার অবস্থায় নেই বা পচে গেছে, সেসব মরদেহ থেকে DNA নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এরপর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দুর্যোগকালীন মরদেহ ব্যবস্থাপনা প্রটোকল অনুসরণ করে সেগুলো সাময়িকভাবে দাফন করা হচ্ছে।
সরকার জানিয়েছে, প্রতিটি অশনাক্ত মরদেহ দাফনের আগে চিকিৎসক ও ফরেনসিক দল DNA নমুনা সংগ্রহ করছে, যাতে পরবর্তীতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।
পরিচয় শনাক্ত হলে পরিবার প্রয়োজন অনুযায়ী মরদেহ পুনরায় উত্তোলন করে নিজেদের ধর্মীয় ও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করতে পারবে।
নেপাল সরকারের তথ্য থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, বিপর্যয়ের ব্যাপকতায় প্রচলিত মরদেহ সংরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
এই কারণেই দেশটি আন্তর্জাতিক সহায়তার অংশ হিসেবে মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য airtight body bag, freezer এবং বিশেষ ফরেনসিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করছে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মৃতদেহ ব্যবস্থাপনার জন্য ইতোমধ্যে airtight body bag পাওয়া গেছে এবং আরও সরবরাহ আসছে।
এছাড়া বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারের কাছ থেকে freezer, DNA testing kit এবং Disaster Victim Identification বা DVI-সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত সহায়তাও চাওয়া হয়েছে।
ভারত থেকে DNA বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞ ১৮ সদস্যের একটি ফরেনসিক দল ২৯ আগস্ট থেকে নেপালে কাজ করছে।
একই সঙ্গে সিঙ্গাপুরের একটি Disaster Victim Identification Team মোতায়েনের বিষয়েও সমন্বয় চলছে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম নেপালের নিজস্ব বাহিনী পরিচালনা করলেও কিছু বিশেষায়িত ক্ষেত্রে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন হচ্ছে।
এসব ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে টানেল উদ্ধার, জীবিত মানুষ শনাক্তে LiDAR ও অন্যান্য প্রযুক্তি, দ্রুত DNA পরীক্ষা, ফরেনসিক শনাক্তকরণ এবং বিপুলসংখ্যক মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা।
এর আগে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও জানিয়েছিলেন, বিপর্যয়ের মাত্রার কারণে মৃতদেহ রাখার উপযোগী বিশেষ mortuary সুবিধা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন।
ভোটেকোশি ও ত্রিশুলি নদীর প্রবল স্রোতে বহু মরদেহ দুর্যোগস্থল থেকে অনেক দূরে ভেসে যাওয়ায় পরিচয় নিশ্চিত করার কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে শরীরের অংশ বা বিকৃত দেহাবশেষ উদ্ধার হওয়ায় কেবল চেহারা বা সাধারণ শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পরিচয় নির্ধারণ সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে DNA পরীক্ষা এখন নিখোঁজদের পরিচয় নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় অপেক্ষা করছেন পরিবার-পরিজনের সদস্যরা। উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র এবং DNA তথ্য মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
সরকার জানিয়েছে, সাময়িক দাফনের অর্থ কোনো মরদেহের পরিচয় নির্ধারণের চেষ্টা বন্ধ করে দেওয়া নয়।
প্রতিটি অশনাক্ত মরদেহের DNA নমুনা, প্রয়োজনীয় নথি এবং দাফনের স্থান সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর পরিবার মরদেহ দাবি করতে পারে।
নেপাল সরকারের সর্বশেষ সরকারি ব্রিফিং অনুযায়ী, ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ৯০৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল এবং প্রায় ৪ হাজার ২০০ মানুষ তখনও নিখোঁজ বা তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি।
অনুসন্ধান অব্যাহত থাকায় আরও মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মরদেহ সংরক্ষণ, DNA শনাক্তকরণ এবং পরিবারের কাছে সঠিক পরিচয় পৌঁছে দেওয়ার চাপও আরও বাড়তে পারে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই কঠিন পরিস্থিতিতে মরদেহ ব্যবস্থাপনায় ICRC-সহ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রটোকল ও নির্দেশিকা অনুসরণ করা হচ্ছে।
সরকারের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো—অশনাক্ত মরদেহগুলোর DNA তথ্য সংরক্ষণ করা, পরিচয় নিশ্চিত করা এবং পরে পরিবারের হাতে যথাযথভাবে মরদেহ হস্তান্তরের সুযোগ রাখা।
বিপর্যয়ের ভয়াবহতায় এখন শুধু জীবিতদের উদ্ধারের লড়াই নয়; মৃতদের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়াও নেপালের উদ্ধার অভিযানের অন্যতম বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: Ministry of Foreign Affairs, Government of Nepal; National Disaster Risk Reduction and Management Authority (NDRRMA) ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ।
ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।






