নেপাল–চীন সীমান্তে হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বন্যা: নেপালে ২৭০ মৃত, ৮২৬ নিখোঁজ; দ্বিতীয় দফা বন্যার শঙ্কা
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম
নেপাল–চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ও বরফ-পাথরের বিশাল ধসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপালে অন্তত ২৭০ জনের মৃত্যু এবং ৮২৬ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। অন্যদিকে তিবতের গিরং এলাকায় তিনজনের মৃত্যু ও ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। উজানে নতুন একটি প্রাকৃতিক ‘ব্যারিয়ার লেক’ সৃষ্টি হওয়ায় দ্বিতীয় দফা আকস্মিক বন্যার আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে।

ভেরিক্সা নিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশ: ৩:৫৭ পিএম
নেপাল–চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও কাদার স্রোতে প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, নেপালে অন্তত ২৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৮২৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
অন্যদিকে চীনের তিবতের গিরং এলাকায় তিনজনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। দুই অঞ্চল মিলিয়ে অন্তত ২৭৩ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ১ হাজার ৩৮৪ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
নেপালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। তাদের মধ্যে প্রায় ১৭৮ জন ভারতীয় এবং ৬০ জনের বেশি মার্কিন নাগরিক।
যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ৩০টির বেশি দেশের নাগরিক নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন।
নিখোঁজ বিদেশিদের একটি বড় অংশ তিবতের পবিত্র কৈলাস পর্বতের উদ্দেশে যাত্রা করছিলেন বলে জানা গেছে।
একই দিনে প্রকাশিত বিভিন্ন আপডেটে মৃতের সংখ্যায় পার্থক্য দেখা গেছে।
নেপালের সরকারি পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং–রেডিও নেপালের আগের এক আপডেটে নেপাল পুলিশের বরাতে ১৭৭টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য জানানো হয়েছিল।
পরে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের আরও নতুন প্রতিবেদনে কর্তৃপক্ষের বরাতে নেপালেই মৃতের সংখ্যা ২৭০-এ পৌঁছানোর কথা বলা হয়।
ফলে হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং উদ্ধার অভিযান চলতে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, চিতওয়ান, তানাহুন এবং আশপাশের অঞ্চল।
ভোটেকোশি ও ত্রিশুলি নদীর প্রবল স্রোত পাহাড়ি এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা, বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নিয়ে আসে।
কয়েকটি গ্রাম প্রায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। নুয়াকোটের সোলেই গ্রামের প্রায় ২৫টি বাড়ির অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
বন্যায় বহু বাড়িঘর, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়েক ডজন সেতু ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রেডিও নেপালের আগের হিসাবে অন্তত ৩৫টি যানবাহন চলাচলের সেতু, ৪৫টি ঝুলন্ত সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছিল।
এর ফলে বহু দুর্গত এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপাল সরকার বড় পরিসরে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। নেপাল আর্মি, নেপাল পুলিশ এবং আর্মড পুলিশ ফোর্সের পাঁচ হাজারের বেশি সদস্য উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন।
হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে খাবার, তাঁবু, ওষুধ এবং জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার অন্তত ১২৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।
গুরুতর আহতদের হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুতে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, সরকার তার সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা উদ্ধার, নিখোঁজদের অনুসন্ধান, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় ব্যবহার করছে।
নেপাল আর্মি, আর্মড পুলিশ ফোর্স এবং নেপাল পুলিশের পাশাপাশি চিকিৎসক, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসাসামগ্রী ও বিশেষ মেডিকেল দল দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে।
কাঠমান্ডুর বীর হাসপাতাল ও ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারে আহতদের জন্য ১০০টি শয্যা সংরক্ষণ করা হয়েছে। অন্যান্য প্রধান হাসপাতালকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বন্যায় বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, ওষুধ এবং অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
নেপাল রেড ক্রস জানিয়েছে, অন্তত তিনটি গ্রামের প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ এবং পানির অবকাঠামো দ্রুত পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে, দুর্যোগের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এনডিআরআরএমএ) ভোটেকোশি, ত্রিশুলি এবং নারায়ণী নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উচ্চ সতর্কতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
রাসুয়া, ধাদিং, নুয়াকোট, গোরখা, চিতওয়ান এবং তানাহুন জেলার নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ও সড়কে যান চলাচলও সীমিত বা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আরও বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তিবতের উজানে একটি প্রাকৃতিক ‘ব্যারিয়ার লেক’ বা বাঁধসদৃশ হ্রদ সৃষ্টি হওয়ায়।
চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হ্রদটি উপচে পড়ছে এবং বাঁধ ভেঙে গেলে বা আকস্মিকভাবে বিপুল পানি নেমে এলে নতুন করে ভয়াবহ ঢল সৃষ্টি হতে পারে।
এ কারণে হ্রদটির পানির স্তর ও ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কয়েকটি গ্রাম থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নেপালের ডিপার্টমেন্ট অব হাইড্রোলজি অ্যান্ড মেটিওরোলজির ২৭ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণী নদীর দেবঘাট স্টেশনে পানির উচ্চতা প্রায় ৪ দশমিক ৯ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে।
সেখানে সতর্কতা সীমা ৭ দশমিক ৩ মিটার এবং বিপৎসীমা ৯ মিটার।
অর্থাৎ ওই নির্দিষ্ট স্টেশনে পানি সতর্কতা সীমার নিচে থাকলেও উজানের পরিস্থিতি, নতুন ভূমিধস এবং ব্যারিয়ার লেকের সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে নদীতীরবর্তী এলাকায় সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়নি।
দুর্যোগের কারণ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য সামনে এসেছে।
শুরুতে ওই অঞ্চলে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস পরে তাদের বিশ্লেষণ পরিবর্তন করে জানায়, এটি প্রকৃত ভূমিকম্প ছিল না।
বরং বিশাল একটি হিমবাহ বা বরফ-পাথরের অংশ ধসে পড়ার কারণে শক্তিশালী ভূকম্পন সংকেত তৈরি হয়েছিল।
ওই বিশাল ধস নদীতে পড়ে পানি, বরফ, পাথর ও কাদার ভয়াবহ ঢল তৈরি করে, যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিচের জনবসতিগুলোতে আঘাত হানে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের বিশেষজ্ঞরাও জানিয়েছেন, একটি হিমবাহ থেকে সৃষ্ট বড় ধরনের অ্যাভালাঞ্চ এই আকস্মিক বন্যার সম্ভাব্য প্রধান কারণ।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ত্রিশুলি নদীর পানির উচ্চতা কোনো কোনো স্থানে মাত্র ৩০ মিনিটে প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল।
বিশেষ করে লেন্দে খোলা নদীতে অত্যন্ত বড় ধরনের বন্যার প্রবাহ দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়া এবং বরফের স্তর অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার কারণে ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
২০২৫ সালের আগস্টেও একই অঞ্চলে তিবতের একটি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ উপচে বন্যা হয়েছিল। ওই ঘটনায় নয়জনের মৃত্যু এবং নেপাল–চীন সংযোগ সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছিল।
সর্বশেষ হিসাবে নেপালে অন্তত ২৭০ জনের মৃত্যু এবং ৮২৬ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক।
তিবতে তিনজনের মৃত্যু এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
দুই অঞ্চল মিলিয়ে অন্তত ২৭৩ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ১ হাজার ৩৮৪ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া অন্তত প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে পাঁচ হাজারের বেশি সেনা ও নিরাপত্তাকর্মী কাজ করছেন।
প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক এবং বহু সেতু ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। আগের সরকারি হিসাবে ৩৫টি মোটরযান চলাচলের সেতু এবং ৪৫টি ঝুলন্ত সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে তিবতের উজানে তৈরি হওয়া ব্যারিয়ার লেক, নতুন ভূমিধস এবং সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা আকস্মিক বন্যাকে।
উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
সূত্র: Associated Press (AP), Reuters, Nepal Police-এর তথ্য উদ্ধৃত করে Public Service Broadcasting–Radio Nepal, Nepal National Disaster Risk Reduction and Management Authority (NDRRMA), Nepal Department of Hydrology and Meteorology (DHM), The Rising Nepal।
ফটো গ্যালারি

- #নেপাল
- #নেপাল বন্যা
- #নেপাল-চীন সীমান্ত
- #হিমবাহ ধস
- #রাসুয়া
- #ত্রিশুলি নদী
- #নিখোঁজ পর্যটক
- #দ্বিতীয় দফা বন্যা
- #Verixa News
ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।






