‘আমরা আজাদির বাংলাদেশ ও আমাদের পূর্ণ মানচিত্র ফেরত চাই’
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:০১ পিএম
শাহবাগের শহীদ ওসমান হাদি চত্বরে ঐতিহাসিক গ্যালারি প্রদর্শনী ও সুধী সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ আজাদ পার্টি। বঙ্গভঙ্গ, দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক নিয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরে দলটির নেতারা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রশ্নে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

ভেরিক্সা নিউজ ডেস্ক, নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৪ পিএম
রাজধানীর শাহবাগে শহীদ ওসমান হাদি চত্বরে ঐতিহাসিক গ্যালারি প্রদর্শনী ও সুধী সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ আজাদ পার্টি। শনিবার (১৫ আগস্ট) সকাল থেকে আয়োজিত প্রদর্শনীতে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন দলিল, মানচিত্র, বই, সংবাদ প্রতিবেদন ও আলোকচিত্র উপস্থাপন করা হয়।
“আগস্ট কেবলই ৩৬ জুলাই নয়, আগস্ট ভারতীয় আধিপত্যবাদের পতনের মাস”—এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠায় জনগণকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
সকাল ১০টায় গ্যালারি প্রদর্শনী শুরু হয়। বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠিত হয় সুধী সমাবেশ। আয়োজকদের ভাষ্য, ১৯০৫ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের ভূখণ্ড, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিভিন্ন বিতর্কিত অধ্যায় মানুষের সামনে তুলে ধরাই ছিল এ আয়োজনের উদ্দেশ্য।
‘আমার মূল ভূখণ্ড কোথায়?’
গ্যালারির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের শিরোনাম ছিল—“আমার মূল ভূখণ্ড কোথায়?” সেখানে ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের প্রস্তাবিত বঙ্গভঙ্গের মানচিত্র এবং ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব বাংলার পাওয়া ভূখণ্ডের মানচিত্র পাশাপাশি প্রদর্শন করা হয়।
প্রদর্শিত তথ্যে আয়োজকেরা দাবি করেন, ১৯০৫ সালের প্রস্তাবিত পূর্ববঙ্গ ও আসামভিত্তিক অঞ্চলের আয়তন ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার ৯৩৮ বর্গমাইল। জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ—যার মধ্যে মুসলমান প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ, হিন্দু প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ প্রায় ১০ লাখ।
তাদের দাবি, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ব বাংলা ওই প্রস্তাবিত ভূখণ্ডের পরিবর্তে প্রায় ৫৫ হাজার বর্গমাইল অঞ্চল পেয়েছিল। এ তথ্য সামনে রেখে তারা প্রশ্ন তোলেন, “প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯০৫ সালের যে মানচিত্র ছিল, ১৯৪৭ সালে আমরা তা কেন পাইনি?”
বক্তারা বলেন, এসব মানচিত্র ও পরিসংখ্যানের ঐতিহাসিক ভিত্তি নতুন করে গবেষণা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বাংলাদেশের কথিত প্রাপ্য ভূখণ্ড ও সীমান্তের প্রশ্নের সমাধান হয়নি বলেও তারা দাবি করেন।
‘ভারতের বাংলাদেশ নাকি আজাদির বাংলাদেশ’
প্রদর্শনীর আরেকটি অংশের শিরোনাম ছিল—“ভারতের বাংলাদেশ নাকি আজাদির বাংলাদেশ”। সেখানে বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক ঘটনা, সীমান্ত পরিস্থিতি, কথিত ভারতীয় হস্তক্ষেপ, পানি ও ভূখণ্ডসংক্রান্ত বিরোধ এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন ও আলোকচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
“আজাদির চাওয়া বনাম ভারতের চাওয়া” শীর্ষক অংশে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন আয়োজকেরা।
তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। দেশের স্বার্থের বিপরীতে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাব বা কর্তৃত্ব গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তারা মন্তব্য করেন।
পূর্ব পাকিস্তানের বৈষম্য ও উন্নয়নচিত্র
“পূর্ব পাকিস্তানের বৈষম্যের বয়ান” শীর্ষক অংশে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মেডিকেল কলেজ, ক্যাডেট কলেজ ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকাল তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি ওই সময়ের সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের তথ্যও প্রদর্শন করা হয়।
আয়োজকেরা বলেন, পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার প্রতি বৈষম্যের অভিযোগের পাশাপাশি ওই সময়ে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোর তথ্যও ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। ইতিহাসের কোনো অংশ বাদ দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একপাক্ষিক বয়ান তৈরি করা উচিত নয়।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়
“কারা রাষ্ট্র বাংলাদেশ” শীর্ষক অংশে মুক্তিযুদ্ধের জনযোদ্ধা, ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন, যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত দলিল ও প্রতিবেদনের অনুলিপি প্রদর্শন করা হয়।
এ ছাড়া পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ, ভারতীয় বাহিনীর উপস্থিতি, স্বাধীনতার ঘোষণাসংক্রান্ত বিতর্ক এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন বই, ছবি ও সংবাদ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
অন্য একটি প্যানেলে শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা নিয়ে আয়োজকদের নিজস্ব রাজনৈতিক বক্তব্যের পক্ষে বিভিন্ন বই, দলিল, চুক্তির অংশ ও প্রতিবেদন প্রদর্শন করা হয়। মুজিবনগর সরকার, কথিত সাত দফা চুক্তি এবং যুদ্ধকালীন যৌথ সামরিক পরিচালনা নিয়েও সেখানে বেশ কিছু বিতর্কিত দাবি তুলে ধরা হয়। এসব বক্তব্য ও উপস্থাপিত তথ্য বাংলাদেশ আজাদ পার্টি এবং প্রদর্শনীর আয়োজকদের নিজস্ব দাবি।
‘ভারত কখনো বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু ছিল না’
সুধী সমাবেশে বাংলাদেশ আজাদ পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল হাসিনুর রহমান হাসিন বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জনগণকে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি বলেন, “আমরা আমাদের আজাদির বাংলাদেশ ফেরত চাই। আমরা আমাদের পূর্ণ মানচিত্র ফেরত চাই। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও আমরা আমাদের কথিত প্রাপ্য ভূখণ্ড ফেরত পাইনি। দেশের স্বাধীনতা ও ভূখণ্ডের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন হলে আমরা আবারও আজাদির লড়াইয়ে নামব।”
তিনি আরও বলেন, “ভারত কখনো বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধুরাষ্ট্র ছিল না। সীমান্ত হত্যা, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, ভূখণ্ড, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং অসম সম্পর্কের অভিযোগের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভারতের ভূমিকাকে বন্ধুত্বপূর্ণ বলার সুযোগ নেই।”
বক্তারা অভিযোগ করেন, শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল থেকে বাংলাদেশের ওপর ভারতীয় রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তী সরকারগুলোও দেশকে সেই প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত করতে পারেনি।
‘আজাদির বাংলাদেশ ফেরত চাই’
সমাবেশে বক্তারা বলেন, আজাদির বাংলাদেশ বলতে তারা এমন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রকে বোঝান, যেখানে কোনো বিদেশি শক্তি দেশের নির্বাচন, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশের জনগণ শুধু একটি পতাকা বা নির্দিষ্ট সীমানার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেনি; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক স্বাধীনতার জন্যও লড়াই করেছে। সেই স্বাধীনতা পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠা করতে দেশের ইতিহাস ও ভূখণ্ডের প্রশ্নে নতুন করে জাতীয় আলোচনা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠান থেকে বঙ্গভঙ্গ, দেশভাগ, সীমান্ত নির্ধারণ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন চুক্তি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিরপেক্ষ গবেষণা পরিচালনার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ন্যায্য অধিকার ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রশ্নে দেশবাসীকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।
সুধী সমাবেশে বাংলাদেশ আজাদ পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল হাসিনুর রহমান হাসিন, ভাইস চেয়ারম্যান কর্নেল ফিরদৌস, মহাসচিব মুনসী বুরহান মাহমুদ, যুগ্ম মহাসচিব রফিকুল ইসলাম সুমনসহ দলটির কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ফটো গ্যালারি

- #বাংলাদেশ আজাদ পার্টি
- #আজাদির বাংলাদেশ
- #ভারতীয় আধিপত্যবাদ
- #ঐতিহাসিক গ্যালারি
- #বঙ্গভঙ্গ
- #শাহবাগ
- #হাসিনুর রহমান হাসিন
- #মুনসী বুরহান মাহমুদ
- #Verixa News
- #ভেরিক্সা নিউজ
ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।






