মাথায় লাল-সবুজের পতাকা বাঁধা ১৬ বছরের কিশোর ঝুলছেন রিকশার পাদানিতে। সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন রিকশাচালক।
মাথায় লাল-সবুজের পতাকা বাঁধা শহীদ গোলাম নাফিজের রিকশার পাদানিতে ঝুলে থাকা ছবিটি কাঁদিয়েছিল গোটা জাতিকে। আন্দোলনে বের হওয়া থেকে দাফন পর্যন্ত তার শেষ ২৪ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ উঠে এসেছে পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়।

মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬
মাথায় লাল-সবুজের পতাকা বাঁধা ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর রিকশার পাদানিতে নিথর হয়ে ঝুলছেন। সামনে এগিয়ে চলেছেন রিকশাচালক। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তোলা হৃদয়বিদারক ছবিটি কাঁদিয়েছিল পুরো জাতিকে। ছবির সেই কিশোর বাংলাদেশ নৌবাহিনী কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শহীদ গোলাম নাফিজ।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়ন ও প্রাণহানির প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছিলেন নাফিজ। সেদিন মহাখালী এলাকায় পুলিশের ছোড়া কয়েকটি রাবার বুলেট তার পায়ে লাগে। আহত হয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিলেও আন্দোলন থেকে সরে যাননি তিনি। গুলির ক্ষত নিয়েই পরবর্তী কর্মসূচিগুলোতে অংশ নিতে থাকেন।
এরপর ৪ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে রাজধানীর ফার্মগেটে গুলিবিদ্ধ হন নাফিজ। পরিবারের সদস্য, সহযোদ্ধা, তাকে হাসপাতালে নেওয়া রিকশাচালক এবং স্বজনদের বর্ণনায় উঠে এসেছে নাফিজের জীবনের শেষ ২৪ ঘণ্টার মর্মান্তিক ঘটনাপ্রবাহ।
নাফিজের বাবা গোলাম রহমান, মা নাজমা আক্তার, বড় ভাই গোলাম রাসেল, রিকশাচালক নূর মোহাম্মদ এবং মামা আবুল হাশেম তার শেষ সময়ের ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন।
১৮ জুলাই প্রথম গুলিবিদ্ধ হন নাফিজ
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে দেশজুড়ে হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। কর্মসূচি সফল করতে ছাত্র-জনতার সঙ্গে মহাখালীতে আন্দোলনে যোগ দেন নাফিজ।
সেদিন মহাখালী এলাকায় পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেট তার পায়ে লাগে। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরে যান তিনি। তবে আহত হওয়ার পরও তার মনোবল ভাঙেনি। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে নয় দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন।
নাফিজের বড় ভাই গোলাম রাসেলও আন্দোলনে অংশ নিতেন। কখনো শাহবাগ, কখনো আদালত প্রাঙ্গণ, আবার কখনো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কর্মসূচিতে দেখা যেত নাফিজকে। আন্দোলন এক দফার দাবিতে রূপ নেওয়ার পর তার বাবা গোলাম রহমান ও মা নাজমা আক্তারও ছেলেদের সঙ্গে রাজপথে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আন্দোলনে যান
৪ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বাবার কাছে কিছু টাকা চান নাফিজ। তার বাবা জানান, একটি কাজ শেষ করে পরিবারের সবাই একসঙ্গে আন্দোলনে বের হবেন। কিন্তু নাফিজ বলেন, তিনি শুধু বাসার সামনের দিকে যাবেন। বাবার কাছ থেকে ৩০ টাকা নিয়ে মাকে সালাম করে বাসা থেকে বের হন তিনি।
মহাখালীর বাসা থেকে বের হয়েই বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন নাফিজ। বাবার দেওয়া টাকা দিয়ে পথে একটি লাল-সবুজের পতাকা কেনেন এবং সেটি মাথায় বেঁধে নেন। পরে বন্ধু শিমুলসহ আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার সঙ্গে ফার্মগেটের দিকে চলে যান।
পরিবার ও সহযোদ্ধাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান। এতে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ অন্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এ সময় নাফিজের বন্ধু তাকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু নাফিজ বলেছিলেন, “আজকে মরে গেলে যাব, দেশকে স্বাধীন করেই ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ।”
পরিস্থিতির অবনতি হলে নাফিজের সঙ্গে থাকা কয়েকজন আন্দোলনকারী একটি মসজিদে আশ্রয় নেন। কিন্তু নাফিজ ও তার বন্ধু শিমুল সেখানে পৌঁছাতে পারেননি। শিমুল তেজতুরিপাড়ার দিকে দৌড়ে গিয়ে একটি রিকশার গ্যারেজে আশ্রয় নেন। অন্যদিকে ছুটতে গিয়ে নাফিজ পুলিশ ও হামলাকারীদের সামনে পড়ে যান। পরিবারের অভিযোগ, সেখানেই খুব কাছ থেকে তার বুকে গুলি করা হয়।
রিকশার পাদানিতে ঝুলছিলেন নাফিজ
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর নাফিজ দীর্ঘ সময় ফার্মগেট ফুটওভারের নিচে রাস্তায় পড়ে ছিলেন। তখনও তার শরীরে প্রাণ ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
রিকশাচালক নূর মোহাম্মদের ভাষ্য অনুযায়ী, আসরের আজানের সময় পুলিশ তাকে ডেকে গুলিবিদ্ধ নাফিজকে রিকশায় তুলতে বলে। তিনি বলেন, “তখন আসরের আজান হচ্ছিল। সময়টা হয়তো পাঁচটা হবে। দেখি নামাজের মতো সিজদা দিয়ে পড়ে আছে। পুলিশ বলল, এই যে লাশ ফেলেছি, এটা তোল। আমি পেছন দিয়ে ধরেছি, পুলিশ পা ধরে আমার গাড়িতে ছুড়ে ফেলেছে।”
তিনি আরও বলেন, “রিকশার পাদানিতে মাথায় পতাকা নিয়ে পড়ে ছিল। দেখে আমার খুব খারাপ লাগছিল। সামনে এগোতেই তার হাত চেইনের সঙ্গে আটকে যাচ্ছিল। হাতটা তুলে রডের ওপর রাখলাম। এরপর তাকে বাঁচানোর জন্য আমি পাগলের মতো চেষ্টা করতে থাকি।”
নাফিজ রিকশা থেকে পড়ে যেতে পারেন—এই আশঙ্কায় নূর মোহাম্মদ খুব ধীরে রিকশা চালাচ্ছিলেন। প্রথমে তিনি নাফিজকে নিকটস্থ আল-রাজী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কয়েকজন তাকে, নাফিজকে এবং রিকশাটি পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এরপর দ্রুত সেখান থেকে বের হয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের দিকে রওনা হন।
চক্ষু হাসপাতালের সামনে পৌঁছানোর পর নূর মোহাম্মদ শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তখন শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিল এবং তিনি পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন।
সেখানে থাকা এক কিশোর তাকে নাফিজকে একটি অটোরিকশায় তুলে দেওয়ার পরামর্শ দেয়। পরে উজ্জ্বল নামে আরেক রিকশাচালকের সহায়তায় নাফিজকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
মায়ের সঙ্গে শেষ কথা
৪ আগস্ট দুপুর ৩টার দিকে নাফিজের সঙ্গে তার মা নাজমা আক্তারের শেষ কথা হয়। মাকে আশ্বস্ত করে নাফিজ বলেছিলেন, “আম্মু, আমি নিরাপদে আছি। বাসায় চলে আসব।”
কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও নাফিজ আর বাসায় ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা আবার যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার বন্ধুরা জানান, নাফিজ তাদের সঙ্গে নেই।
সন্ধ্যা ৬টার দিকে নাফিজের বন্ধু শিমুল বাসায় ফিরলেও নাফিজ ফেরেননি। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। তাদের ধারণা ছিল, নাফিজ হয়তো পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন। এরপর আশপাশের বিভিন্ন থানা ও হাসপাতালে খোঁজ শুরু করেন তারা।
কোথাও তার সন্ধান না পেয়ে দিশাহারা হয়ে পড়ে পুরো পরিবার। নাফিজের মামারাও বিভিন্ন জায়গায় তাকে খুঁজতে থাকেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবিতে নাফিজকে শনাক্ত
নাফিজের বড় ভাই গোলাম রাসেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিকশার পাদানিতে ঝুলে থাকা কিশোরের ছবিটি দেখে নিজের ভাইকে চিনতে পারেন। তিনি বিষয়টি বাবাকে জানান।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবির সূত্র ধরে রিকশাচালক নূর মোহাম্মদের নম্বর সংগ্রহ করে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে পরিবার। এরপর তারা রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে নাফিজের খোঁজ করতে শুরু করেন।
নাফিজের মামা আবুল হাশেম এবং মামি আফরোজা আক্তার সীমা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন জায়গায় তাকে খোঁজেন। মর্গেও খোঁজ নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মেডিকেল থেকে ফেরার পথে নাফিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা আলাদা আলাদা হাসপাতালে খোঁজ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নাফিজের মামা ও মামি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে যান।
মর্গের ড্রয়ারে পাওয়া যায় নাফিজকে
আবুল হাশেম জানান, পুরো হাসপাতাল এবং রোগীদের নিবন্ধন খাতা খুঁজেও নাফিজের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালের মর্গে যান।
সেখানে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে নাফিজের ছবি দেখালে তিনি তাদের মর্গের ভেতরে নিয়ে একটি ড্রয়ার খুলে দেন। সেখানে তারা নাফিজের নিথর মরদেহ দেখতে পান।
সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে আবুল হাশেম বলেন, “ড্রয়ার খুলে আমাকে নাফিজকে দেখাল। আমি কান্নাকাটি করছিলাম। আমার স্ত্রী বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, এটি নাফিজ। মর্গের লোক বলছিলেন, নারী মানুষ সহ্য করতে পারবে না, ভেতরে নেওয়া যাবে না।”
অনেক অনুরোধের পর তার স্ত্রীকেও ভেতরে যেতে দেওয়া হয়। নাফিজের চেহারা দেখে তারা নিশ্চিত হন, রিকশার পাদানিতে ঝুলে থাকা কিশোরটি তাদেরই স্বজন।
মর্গের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি তাদের অল্প সময়ের মধ্যে মরদেহ নিয়ে যেতে বলেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে না নিলে পরে মরদেহ কোথায় যাবে, তা কেউ বলতে পারবে না বলেও সতর্ক করা হয়।
এমন অবস্থায় নাফিজের মৃত্যুর খবর তার বাবা-মাকে কীভাবে জানাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান আবুল হাশেম। শেষ পর্যন্ত তিনি নাফিজের বাবাকে ফোন করে শুধু বলেন, “ভাই, নাফিজকে পাওয়া গেছে। আপনারা দ্রুত চলে আসেন।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই নাফিজের বাবা-মা ও বড় ভাই হাসপাতালে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, তাদের প্রিয় নাফিজ আর বেঁচে নেই। ছেলের মরদেহ দেখে শোকে ভেঙে পড়েন বাবা-মা।
মরদেহ নিতে পুলিশি বাধা
পরিবারের অভিযোগ, নাফিজের মরদেহ নিয়ে ফেরার সময়ও তাদের নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ নেওয়ার পথে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও হয়রানির শিকার হন তারা।
নাফিজের বড় ভাই গোলাম রাসেল তখন মরদেহটিকে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া একজন বৃদ্ধের মরদেহ বলে পরিচয় দিয়ে কোনোমতে পুলিশি বাধা এড়িয়ে যান। পরে ভোরে নাফিজের মরদেহ দক্ষিণখানের দোবাদিয়া বাজার এলাকায় তার দাদাবাড়িতে নেওয়া হয়।
পরদিন সকাল ৯টায় জানাজা শেষে নাফিজের মরদেহ মধুবাগ গণকবরস্থানে দাফনের জন্য নেওয়া হচ্ছিল। পরিবারের অভিযোগ, পথেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়েন তারা। এ কারণে মূল সড়ক দিয়ে মরদেহ নিয়ে যেতে পারেননি।
আবুল হাশেম ও গোলাম রাসেল জানান, স্থানীয় লোকজন তাদের সতর্ক করে বলেছিলেন, সড়কে অস্ত্র নিয়ে কয়েকজন অবস্থান করছেন। পরে অনেকটা পথ ঘুরে কোমরসমান পচা পানি পার হয়ে নাফিজের মরদেহ কবরস্থানে নিতে হয়। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।
সেনাপ্রধান হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন নাফিজ
শহীদ গোলাম নাফিজ ভবিষ্যতে সেনাপ্রধান হয়ে দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন বলে জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। তার শাহাদত পুরো পরিবারকে গভীর শোকে নিমজ্জিত করেছে।
তবে নাফিজের ত্যাগ ও সাহস দেশের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বলে মনে করেন তার বড় ভাই গোলাম রাসেল।
৪ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে বাসা থেকে আন্দোলনে যোগ দিতে বের হয়েছিলেন নাফিজ। গুলিবিদ্ধ হওয়া, হাসপাতালে নেওয়া, পরিবারের দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং নানা বাধার মধ্য দিয়ে ঠিক ২৪ ঘণ্টা পর ৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
বিচারের দাবি পরিবারের
নাফিজ হত্যার বিচার প্রসঙ্গে বড় ভাই গোলাম রাসেল বলেন, জুলাই আন্দোলনে সহপাঠী ও সহযোদ্ধাদের হত্যার বিচারের দাবিতে তার নিরস্ত্র ভাই রাজপথে নেমেছিলেন। কিন্তু তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছোটার পরও আমার ভাই রক্ষা পায়নি। আমার কলিজার টুকরা ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের আদেশদাতা থেকে শুরু করে বাস্তবায়নকারী—কাউকেই ছাড় দেওয়া যাবে না।”
প্রত্যেক শহীদ হত্যার নির্দেশদাতা এবং তা বাস্তবায়নে জড়িত সবাইকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে গোলাম রাসেল বলেন, পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির কথা বলা হলেও দেশে থাকা অনেক অভিযুক্তের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত বিচার দেখা যাচ্ছে না।
যেসব ঘটনায় সরাসরি গুলিবর্ষণের ভিডিও রয়েছে, সেসব ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি কম হওয়া এবং অধিকাংশ শুটার এখনো গ্রেপ্তার না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
গোলাম রাসেল বলেন, “একটি বিপ্লব হয়েছে, কিন্তু সেই বিপ্লবের সুফল এখনো পুরোপুরি জনগণের ঘরে পৌঁছায়নি। সরকার যদি বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করতে না পারে এবং শহীদদের প্রত্যাশা বাস্তবায়ন না করে, তাহলে দেশের মানুষই বিপ্লবের পূর্ণতা দেবে। বিপ্লব চলমান।”
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ঘটনার সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ছিলেন ডা. শফিউর রহমান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, সেই সময় ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য গুরুতর আহত রোগী হাসপাতালে আনা হয়েছিল।
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে জরুরি বিভাগে দাঁড়ানোর জায়গাও ছিল না। এত সময় পর কোনো নির্দিষ্ট রোগীর চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. শফিউর রহমান বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসকেরা সে সময় সর্বাত্মকভাবে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি ছিল না। তবে গভীর রাতে মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
বিচারের বর্তমান অবস্থা
দীর্ঘ তদন্তের পর ফার্মগেট এলাকায় গোলাম নাফিজসহ তিনজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।
অভিযোগ আমলে নিয়ে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এ মামলায় এখন পর্যন্ত সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শচীন মৌলিক গ্রেপ্তার রয়েছেন।
পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ঢাকা মহানগর পুলিশের তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজ আল ফারুক জুয়েল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রুবাইয়াত জামান ফাহিম এবং তেজগাঁও থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসীন।
নাফিজের পরিবারের প্রত্যাশা, শুধু এই মামলাই নয়—জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা, পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
ফটো গ্যালারি

- #ভেরিক্সা নিউজ
- #Verixa News
- #শহীদ গোলাম নাফিজ
- #Golam Nafiz
- #জুলাই বিপ্লব
- #July Revolution
- #জুলাই গণঅভ্যুত্থান
- #বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন
- #ফার্মগেট
- #শহীদ নাফিজ
- #জুলাই শহীদ
- #বাংলাদেশ
- #জুলাই হত্যাকাণ্ড
- #নাফিজের শেষ ২৪ ঘণ্টা

