লাইভ
বাংলাদেশ৩ ঘণ্টা আগে

৫৩৭ জনের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার

জুলাই বিপ্লবের ২০ দিনে গুলিতে অন্তত ৫৩৭ জন দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৪ জন দুই চোখ এবং ৪৯৩ জন এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন।

৫৩৭ জনের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার
শেয়ার করুন

ভেরিক্সা নিউজ ডেস্ক

ছবি: সংগৃহীত

জুলাই বিপ্লবে রাজপথ যখন রক্তে রঞ্জিত, তখন দেশের প্রতিবাদী প্রজন্মকে ঘিরে রচিত হচ্ছিল বিভীষিকাময় আরেকটি অধ্যায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পুলিশ বাহিনীর গুলিতে বিদীর্ণ হয়েছিল শত শত স্বপ্নাতুর চোখ।

১৭ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত মাত্র ২০ দিনে গুলিতে অন্তত ৫৩৭ জন দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৪ জন দুই চোখের আলো হারিয়েছেন এবং ৪৯৩ জন স্থায়ীভাবে এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন ও জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, দুই চোখের দৃষ্টি হারানো ৪৪ জনের মধ্যে ১৩ জন শিক্ষার্থী, পাঁচজন ব্যবসায়ী, চারজন গাড়িচালক, চারজন চাকরিজীবী, দুজন শ্রমিক এবং একজন গৃহিণী। বাকি ১৫ জনের পেশাগত পরিচয় জানা যায়নি।

দৃষ্টিশক্তি হারানো ব্যক্তিদের অনেকের মাথায় এখনো গুলি বা ছররা রয়ে গেছে। আহত হওয়ার পর তাঁদের কাউকে কাউকে মৃত ভেবে লাশের সঙ্গে ফেলে রাখার অভিযোগও রয়েছে।

চোখে আঘাত পাওয়া এসব মানুষের অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। বর্তমানে তাঁদের অধিকাংশই অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সরকারি ভাতায় কোনোমতে জীবনযাপন করলেও ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রয়োজনের তুলনায় এ সহায়তা অপ্রতুল। পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

২০২৫ সালের আগস্টে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দেন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালের রেটিনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা। তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান, আন্দোলনের সময় চোখে গুলিবিদ্ধ ৮৬৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৪৯৩ জন স্থায়ীভাবে এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।

প্রথম দিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, অপারেশন থিয়েটারে থাকার সময় জরুরি বিভাগে বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপের খবর পান। সেখানে গিয়ে তিনি শতাধিক আহত ব্যক্তিকে রক্তাক্ত অবস্থায় চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকতে দেখেন।

আহত ব্যক্তিদের অধিকাংশের বয়স ছিল ১৪ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। কেউ এক চোখ ধরে বসেছিলেন, আবার কেউ দুই চোখ। গুলিতে অনেকের চোখ ছিদ্র হয়ে রক্ত ঝরছিল। অনেকের কর্নিয়া, স্ক্লেরা ও চোখের অন্যান্য অংশ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা আরও জানান, সব আহত ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। হয়রানির আশঙ্কায় অনেকেই হাসপাতালে ভর্তির সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল নাম ও ফোন নম্বর দিয়েছিলেন।

আমাকে লাশের সঙ্গে ফেলে রাখা হয়েছিল

জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার বাহিনীর হা’ম’লায় চোখের দৃষ্টি হারালেও দেশের প্রতি নিজের অঙ্গীকার থেকে সরে যাননি সাব্বির আহমাদ। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট কারওয়ান বাজারে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

সেদিনের কথা স্মরণ করে সাব্বির বলেন, ‘আমাকে যখন ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমাকে লাশের সঙ্গে ফেলে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে আল্লাহ আমাকে ফিরিয়ে এনেছেন।’

দৃষ্টি হারালেও দেশের প্রতি ভালোবাসা কমেনি বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘এ দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সুইয়ের মাথায় যতটুকু জমি থাকবে, সেটুকুর আজাদি নিশ্চিত করা পর্যন্তও আমাদের লড়াই চলবে।’

তিনি বলেন, এ লড়াই থেমে যাওয়ার নয়। একই সঙ্গে জুলাইয়ের চেতনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধেও সতর্কবার্তা দেন সাব্বির।

ব্যক্তিগত জীবনের বেদনাও তুলে ধরেন তিনি। আড়াই মাস বয়সী নিজের একমাত্র সন্তানকে কখনো চোখে দেখেননি সাব্বির। স্পর্শ করেই সন্তানকে অনুভব করেন।

তারপরও তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, শুনেছি আমার সন্তান খুবই সুন্দর হয়েছে।’

দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও স্বপ্নে নিজেকে পাহাড় ও প্রকৃতিতে ঘুরে বেড়াতে দেখেন বলে জানান সাব্বির। তবে ঘুম ভাঙার পর বাস্তবতা তাঁকে আবারও কষ্ট দেয়।

সরকারি ভাতা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা হাত পাততে চাই না। যোগ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন সেক্টরে আমাদের চাকরির ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি রইল।’

গুলিটা এখনো মাথার ভেতরেই আছে

২০২৪ সালের ২০ জুলাই রাজধানীর বাড্ডায় গুলিবিদ্ধ হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান দুর্জয় আহমেদ।

সেদিনের নৃশংসতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘গুলিটা আমার চোখে লাগার আগে আরও দুজনের মাথা ভেদ করে আমার চোখের ভেতরে ঢুকে যায়। গুলিটা এখনো আমার মাথার ভেতরেই আছে।’

দুর্জয় আহমেদের কণ্ঠে ঝরে পড়ে অভিমানে ভরা আর্তি। তিনি বলেন, দুই চোখের আলো হারানো ৪৩ থেকে ৪৪ জন জুলাইযোদ্ধা বর্তমানে সমাজে অনেকটাই অবহেলিত। তাঁদের চলাফেরা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবন অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

তাঁর ভাষায়, জুলাইযোদ্ধারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নন। তাঁরা দেশের জন্য লড়েছেন এবং তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

মৃত্যুর অপেক্ষাই বেশি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মিরপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান মিজানুর রহমান। দুই চোখে পাঁচটি অস্ত্রোপচারের পরও তাঁর দৃষ্টি ফেরেনি।

একসময় নিজের আয়ে সংসার চালানো মানুষটি বর্তমানে পুরোপুরি অন্যের ওপর নির্ভরশীল। আগে তিনি একজন প্রকৌশলীর গাড়ি চালিয়ে মাসে ৩২ হাজার টাকা বেতন পেতেন। বর্তমানে সরকারি ২০ হাজার টাকার ভাতায় চিকিৎসা, ওষুধ ও সংসারের ব্যয় মেটানো তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

চোখের আলো হারিয়ে অন্ধকারেই কাটছে তাঁর প্রতিটি দিন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন চোখের আলো ফেরার চেয়ে হয়তো মৃত্যুর অপেক্ষাই বেশি।’

আমাদের পরিবারের লড়াই এখন আরও বেড়েছে

রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে দুই চোখের দৃষ্টি হারান নিলু পারভিন। আরবি পড়িয়ে বাড়ি ফেরার পথে তিনি আহত হয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘রান্নাঘরেও যেতে পারি না। সামান্য কাজগুলোও আন্দাজ করে করতে হয়। বাকি কাজ আমার স্বামী করেন। দিনভর রিকশা চালিয়ে এসে সংসারের কাজেও সহযোগিতা করেন তিনি। দুই সন্তানকে ঠিকভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। আমার পরিবারের লড়াই এখন আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।’

দেশের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে নিলু পারভিন বলেন, ‘আমরা সব আল্লাহর কাছে ছেড়ে দিয়েছি। আল্লাহই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য সবকিছু করবেন। আমাদের দুঃখ-কষ্ট কেউ বোঝে না, কেউ দেখে না। তারা আমাদের নিয়ে ভাবেও না। কিন্তু আমার রব নিশ্চয়ই উত্তম পরিকল্পনাকারী।’

সময় এখন পুনর্বাসনের

দৃষ্টিশক্তি হারানো জুলাইযোদ্ধারা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দল-মত নির্বিশেষে জুলাইয়ের ঘোষিত আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

রাষ্ট্র যেন জুলাই বিপ্লব, শহীদ, যোদ্ধা এবং তাঁদের পরিবারকে ধারণ করে এবং তাঁদের ত্যাগকে যথাযথ মর্যাদা দেয়—এটিই তাঁদের অন্যতম প্রধান দাবি।

জুলাই শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন ও জুলাইযোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করা জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর বলেন, জুলাইয়ে চোখে গুলিবিদ্ধ মানুষের সংখ্যা হাজার হাজার।

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রায় এক হাজার আহত ব্যক্তির মধ্যে ৪৪ জন দুই চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন।

কী ধরনের গুলির আঘাতে জুলাইযোদ্ধারা দৃষ্টিহীন হয়েছেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তাঁদের অধিকাংশই ৭.৬২ মিলিমিটার বুলেটে এবং বাকিরা প্যালেট বা ছররা গুলিতে আহত হয়েছেন। এ ছাড়া শত শত আহত ব্যক্তি এখনো চোখের ভেতরে প্যালেট নিয়ে অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করছেন।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের বাহিনীর বুলেট হয়তো তাঁদের চোখের আলো কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু মনোবল ভাঙতে পারেনি।’

তিনি বলেন, ‘জীবনের আলো বিসর্জন দেওয়া এসব যোদ্ধা এবং তাঁদের মতো হাজারো যোদ্ধার পুনর্বাসন ও সম্মান নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আমরা তাঁদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও দেশের মানুষ এ দায়িত্ব পালন করবে বলে আমরা আশাবাদী।

ফটো গ্যালারি

৫৩৭ জনের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার — 1
  • #জুলাই বিপ্লব
  • #জুলাই আন্দোলন
  • #জুলাইযোদ্ধা
  • #দৃষ্টিশক্তি হারানো
  • #চোখে গুলিবিদ্ধ
  • #জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন
  • #জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট
  • #সাব্বির আহমাদ
  • #দুর্জয় আহমেদ
  • #মিজানুর রহমান
  • #নিলু পারভিন
  • #পুনর্বাসন
  • #আওয়ামী লীগ সরকার
  • #শেখ হাসিনা
  • #July Uprising
  • #July Fighters
  • #Eye Injuries
  • #Rehabilitation
  • #Bangladesh News
শেয়ার করুন

সম্পর্কিত খবর

ভেরিক্সা নিউজ