যে অটোরিকশা ঢাকার সড়ক থেকে সরানোর কথা, সেই অটোরিকশাতেই বসছে কিউআর কোড
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৫ এএম
ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়ার কথা বিভিন্ন সময়ে সিটি করপোরেশন ও ডিএমপির পক্ষ থেকে বলা হলেও এখন এসব যানকে পুরোপুরি বন্ধ না করে ডিজিটাল নিবন্ধনের আওতায় আনার পথে যাচ্ছে সরকার। নতুন নীতিমালায় প্রতিটি অটোরিকশায় কিউআর কোড ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, এলাকাভিত্তিক চলাচল এবং পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

ভেরিক্সা নিউজ ডেস্ক
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, সেই অটোরিকশাকেই এবার কিউআর কোড ও ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনতে যাচ্ছে সরকার।
রাজধানীতে যানজট, উল্টো পথে চলাচল, বেপরোয়া গতি, নম্বরপ্লেট না থাকা এবং প্রধান সড়কে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ—এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে নিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় আনার সিদ্ধান্তের কথা সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
এর আগে স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্ট পর্যায় এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রধান সড়কে এসব অটোরিকশার চলাচল সীমিত করা এবং পর্যায়ক্রমে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
ডিএমপিও প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ঠেকাতে অভিযান ও ডাম্পিং কার্যক্রম চালিয়েছে।
কিন্তু এবার সরকারের নতুন অবস্থান হচ্ছে—পুরোপুরি তুলে না দিয়ে প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা।
### প্রতিটি অটোরিকশায় কিউআর কোড
জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য রেহানা আক্তার রানুর একটি নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও বিধিবিধান ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি অটোরিকশা একটি ডিজিটাল নিবন্ধনের আওতায় থাকবে।
যানে কিউআর কোড এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে অবৈধভাবে একাধিক অটোরিকশা চালানোর সুযোগ বন্ধ করা এবং কোন গাড়ি কোথায় চলাচল করছে, সেটি শনাক্তযোগ্য করা।
### বন্ধ নয়, এলাকাভিত্তিক চলাচল
সরকারের পরিকল্পনায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ করার পরিবর্তে নির্দিষ্ট এলাকা বা জোনের মধ্যে চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
এর মাধ্যমে প্রধান সড়কে এসব যান প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে অলিগলি ও নির্ধারিত এলাকায় চলাচলের সুযোগ রাখা হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, নীতিমালা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে চালকদের কর্মসংস্থান হঠাৎ বন্ধ হয়ে না যায়।
অর্থাৎ সরকারের নতুন কৌশল হচ্ছে—জীবিকা বজায় রেখে যানগুলোকে নিবন্ধন, প্রযুক্তি ও সুনির্দিষ্ট চলাচল এলাকার মধ্যে নিয়ে আসা।
### ঢাকার যানজটে দীর্ঘদিনের অভিযোগ
ঢাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানজট এবং সড়ক শৃঙ্খলা নিয়ে অভিযোগও বেড়েছে।
প্রধান সড়কে উঠে পড়া, বিপরীত দিকে চলাচল, যেখানে-সেখানে মোড় নেওয়া এবং ট্রাফিক সিগন্যাল না মানার অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে।
নম্বরপ্লেট বা কার্যকর নিবন্ধন ব্যবস্থা না থাকায় এসব যানের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থায় ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন।
সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, ঢাকার ১৭টি সিগন্যালে চালু থাকা ৫০টি এআইনির্ভর ট্রাফিক ক্যামেরা অন্যান্য যানবাহনের অনিয়ম শনাক্ত করতে পারলেও অটোরিকশায় নম্বরপ্লেট না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে একইভাবে জরিমানা বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
### আরও ২০০ এআই ক্যামেরা বসানোর কাজ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে থাকা ৫০টি এআই ক্যামেরা থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
এর ধারাবাহিকতায় তেজগাঁও ও রমনা বিভাগে আরও ২০০টি এআই ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে।
পর্যায়ক্রমে এই ব্যবস্থা পুরো রাজধানীতে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে কিউআর কোড ও ডিজিটাল নিবন্ধন কার্যকর হলে অটোরিকশাকেও এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির আওতায় আনা সহজ হবে বলে সরকারের পরিকল্পনা থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
### সারাদেশে ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে।
এসব যান দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করছে বলে তিনি সংসদে জানান।
অথচ বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৩০০।
শুধু ঢাকাতেই আনুমানিক ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে সরকারের ধারণা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
### লেড-এসিড ব্যাটারিও বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা
নতুন নীতিমালায় শুধু নিবন্ধন নয়, ব্যাটারির ধরনেও পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত লেড-এসিড ব্যাটারির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের শর্ত আরোপ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, লেড-এসিড ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবহার ও রিসাইক্লিংয়ের কারণে সিসা ও অন্যান্য দূষণ বাতাস, মাটি ও পানির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
### দুর্ঘটনায় অটোরিকশার সম্পৃক্ততার তথ্য
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সম্পৃক্ততা ছিল।
### নিষেধাজ্ঞা থেকে নিয়ন্ত্রণে?
সরকারি বক্তব্যের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে নীতিতে এখন একটি স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
এর আগে মূল সড়ক থেকে এসব যান সরানো, অভিযান এবং ডাম্পিংয়ের ওপর জোর দেওয়া হলেও নতুন পরিকল্পনায় প্রযুক্তি, নিবন্ধন ও জোনিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের দিকে যাচ্ছে সরকার।
তবে নতুন নীতিমালায় ঠিক কতগুলো অটোরিকশা নিবন্ধনের সুযোগ পাবে, কোন কোন এলাকায় চলতে পারবে, কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা কে পরিচালনা করবে এবং প্রধান সড়কের নিষেধাজ্ঞা আগের মতো থাকবে কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত বাস্তবায়ন নির্দেশনা এখনো সামনে আসেনি।
উল্লেখ্য, সংসদে এ বিষয়ে কোনো নতুন বিল পাসের কথা বলা হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নীতিমালা ও বিধিবিধান প্রণয়নের অগ্রগতি এবং সরকারের পরিকল্পনা সংসদকে জানিয়েছেন।

ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।






