কুমিল্লা নগরীতে ‘যত গলি তত গ্যাং’, সক্রিয় অন্তত ২০ কিশোর গ্রুপ
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৭ এএম
কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা, বিনোদনকেন্দ্র ও ব্যস্ত সড়ক ঘিরে কিশোরদের একাধিক গ্রুপ সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ, স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নগরীতেই অন্তত ২০টি কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্বের কথা উঠে এসেছে। হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর জেলাজুড়ে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করেছে পুলিশ।

ভেরিক্সা নিউজ বিশেষ প্রতিনিধি
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সন্ধ্যা নামলেই কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন গলি, বিনোদনকেন্দ্র ও ব্যস্ত সড়কের পাশে কিশোরদের ছোট-বড় জটলা চোখে পড়ে। বাইরে থেকে সাধারণ আড্ডা মনে হলেও স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, এসব এলাকার অনেক জায়গাতেই গড়ে উঠেছে কিশোরদের বিভিন্ন গ্রুপ ও উপদল।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু কুমিল্লা নগরীতেই অন্তত ২০টি কিশোর গ্যাং বা গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সময়ের সঙ্গে পুরোনো গ্রুপ ভেঙে নতুন উপদলও তৈরি হচ্ছে। :chatgpt-content-reference{index="0"}
### নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিস্তার
চর্থা, ধর্মপুর, শাসনগাছা, ছোটরা, ভাটপাড়া, কালিয়াজুড়ি, সংরাইশ, অশোকতলা, ঠাকুরপাড়া, টমছমব্রিজ, সুজানগর, রেসকোর্সসহ নগরীর একাধিক এলাকায় কিশোর গ্রুপের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
কান্দিরপাড়ের পাশের ধর্মসাগর পাড় ও নগর উদ্যান এলাকাও দীর্ঘদিন ধরে কিশোরদের আড্ডার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় অনেক সময় দলবদ্ধ কিশোরদের উপস্থিতি বাড়ে। এতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া অনেকেই অস্বস্তি বোধ করেন।
### অন্তত ২০ প্রধান গ্রুপ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে রতন গ্রুপ বা ‘আর স্কোয়াড’, ঈগল, সিবিকে, কিং স্কোয়াড, রেড ৯৯৯, কেজিএসসহ বিভিন্ন নামের গ্রুপের কথা উঠে এসেছে।
তবে কুমিল্লা জেলা পুলিশের কাছে বর্তমানে সব সক্রিয় গ্রুপের কোনো পূর্ণাঙ্গ হালনাগাদ তালিকা নেই বলে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। :chatgpt-content-reference{index="1"}
কুমিল্লা নগরীতে ২০১৫ সালের দিক থেকে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেশি আলোচনায় আসে। ২০২২ সালের দিকে আলোচিত গ্রুপের সংখ্যা অন্তত ২০টিতে পৌঁছায় বলে একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। :chatgpt-content-reference{index="2"}
### হত্যা-ছিনতাই-মাদকসহ নানা অভিযোগ
বিভিন্ন সময়ে এসব গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ইভটিজিং ও মোটরসাইকেল চুরিসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
প্রথম আলোর সাম্প্রতিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কুমিল্লায় অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাং সদস্যদের নাম এসেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রায় নয় মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধের সঙ্গেও এমন গ্রুপের সদস্যদের নাম পাওয়া গেছে। :chatgpt-content-reference{index="3"}
তবে কোনো গ্রুপ বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তা আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় না।
### অপ্রতিম হত্যার পর নতুন করে আলোচনায়
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর গ্যাং ইস্যুটি আবার সামনে আসে।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে এক তরুণ ও দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমকে নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পর তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় এবং ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে আঘাত করা হয়। :chatgpt-content-reference{index="4"}
কিছু প্রতিবেদনে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্যও উঠে এসেছে। :chatgpt-content-reference{index="5"}
### অভিযানে শত শত আটক
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লাজুড়ে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান জোরদার করে পুলিশ।
বিভিন্ন দফায় শত শত কিশোর ও তরুণকে আটক করে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। অনেককে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং যাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক অভিযানের এক পর্যায়ে ১৮ থানায় ৬২৪ জনকে আটকের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল। :chatgpt-content-reference{index="6"}
### রাজনৈতিক আশ্রয়ের অভিযোগও আছে
কুমিল্লার কিশোর গ্যাংগুলো স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয় পায়—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সাম্প্রতিক সময়ে কথিত গ্যাং সদস্য বা নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে, কিশোর গ্যাং নেতা হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের এক নেতার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার খবর প্রকাশ করেছে আমার দেশ। :chatgpt-content-reference{index="7"}
তবে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে ছবি বা ভিডিও থাকা মাত্রই অপরাধে পৃষ্ঠপোষকতা প্রমাণ করে না। কারা বাস্তবে কোনো অপরাধী গ্রুপকে আশ্রয় বা সহায়তা দিচ্ছেন, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের বিষয়।
### কিশোরদের বড় অংশই শিক্ষার্থী
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক কিশোরদের বড় একটি অংশ শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে স্কুল-কলেজ থেকে ঝরে পড়া কিশোরদের মধ্যেও গ্যাংয়ে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
### পুলিশ কী বলছে
কুমিল্লা জেলা পুলিশ জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধপ্রবণতা ঠেকাতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, কোনো চাপ বা প্রভাবের কারণে অভিযান বন্ধ করার প্রশ্ন নেই এবং অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকাতে শুধু আটক নয়—গ্রুপগুলোর নেতৃত্ব, অর্থের উৎস, অস্ত্র ও মাদকের যোগান এবং সম্ভাব্য পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্কও শনাক্ত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।






