দুর্গম পাহাড়ের বুকে লুকানো সাইংপ্রা ঝর্ণা, ট্রেকারদের নতুন আকর্ষণ আলীকদমে
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৮ পিএম
বান্দরবানের আলীকদমে চিম্বুক রেঞ্জের কির্সতং পাহাড়ের কাছে অবস্থিত সাইংপ্রা ঝর্ণা এখন অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী ট্রেকারদের কাছে আকর্ষণীয় এক গন্তব্য। চার থেকে পাঁচ ধাপের এই বুনো ঝর্ণায় পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ, পিচ্ছিল ও দুর্গম পাহাড়ি ট্রেইল। স্থানীয় গাইড ছাড়া এই পথে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করেছেন ট্যুর গাইডরা।

ভেরিক্সা নিউজ আলীকদম প্রতিনিধি
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গভীর বন, খাড়া পাহাড়, পাথুরে পথ আর ঝিরির শব্দ—সব মিলিয়ে বান্দরবানের আলীকদমের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে লুকিয়ে আছে বুনো সৌন্দর্যের এক অনন্য নাম সাইংপ্রা ঝর্ণা।
আলীকদম উপজেলার পূর্বাঞ্চলে চিম্বুক রেঞ্জের কির্সতং পাহাড়ের কাছাকাছি এই ঝর্ণার অবস্থান।
পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মতো এখানে সহজে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। দুর্গম পাহাড়ি পথ, বড় বড় পাথর আর পিচ্ছিল ট্রেইল পার হয়ে তবেই দেখা মেলে সাইংপ্রার।
ঝর্ণাটিতে মোটামুটি চার থেকে পাঁচটি ধাপ রয়েছে। প্রতিটি ধাপের দৃশ্য ও বৈশিষ্ট্য আলাদা।
কির্সতং ও রুংরাং পাহাড়ে ট্রেকিং করতে যাওয়া অনেক অভিযাত্রী তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনার সঙ্গে সাইংপ্রা ঝর্ণাকেও যুক্ত করেন।
কারণ, শুধু ঝর্ণার সৌন্দর্য নয়—সেখানে পৌঁছানোর পুরো যাত্রাপথটিই ট্রেকারদের জন্য এক বিশেষ অভিজ্ঞতা।
### দুর্গম পথ পেরিয়ে সাইংপ্রা
আলীকদমের মেনিয়াংক পাড়া থেকে রুংরাং ও কির্সতং পাহাড়ের পথে যাত্রার পর খেমচং পাড়া হয়ে সাইংপ্রা ঝর্ণার দিকে যেতে হয়।
ট্রেইলের শুরুতেই খাড়া পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে হয়।
এরপর শুরু হয় বড় বড় বোল্ডার আর পিচ্ছিল পাথরে ভরা মূল পথ।
বর্ষাকালে ট্রেইলটি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ভেজা পাথরের ওপর পা রেখে চলার সময় পিছলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কোথাও পাথর আঁকড়ে এগোতে হয়, আবার কোথাও নিচের পথ শেষ করে খাড়া অংশ বেয়ে ওপরে উঠতে হয়।
দীর্ঘ সময়ের ট্রেকিংয়ের পর হঠাৎ পাহাড়ের বুকের ভেতর চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাইংপ্রা ঝর্ণা।
ট্রেকারদের কাছে এই মুহূর্তটিই পুরো অভিযাত্রার অন্যতম বড় প্রাপ্তি।
### যেভাবে যেতে হয়
সাইংপ্রা ঝর্ণায় যেতে প্রথমে দেশের যেকোনো স্থান থেকে বান্দরবানের আলীকদমে পৌঁছাতে হবে।
সেখান থেকে স্থানীয় একজন অভিজ্ঞ গাইড সঙ্গে নেওয়া জরুরি।
পাহাড়ি পথটি দুর্গম হওয়ায় গাইড ছাড়া সেখানে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
গাইডের নির্দিষ্ট কোনো নির্ধারিত ফি নেই। স্থানীয়ভাবে আলোচনা করে পারিশ্রমিক ঠিক করতে হয়।
আলীকদমের আমতলী ঘাট থেকে তৈনখালের উজান ধরে নৌকায় দুছরী বাজারে যেতে হয়।
দুছরী বাজার থেকেই মূল হাঁটা পথ শুরু।
সেখান থেকে ট্রেকিং করে মেনকিউ পাড়া এবং পরে মেনিয়াংক পাড়ায় পৌঁছাতে হয়।
মেনিয়াংক পাড়া থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটলে রুংরাং পাহাড় এলাকায় পৌঁছানো যায়।
এরপর খেমচং পাড়া। খেমচং পাড়া থেকেই শুরু হয় সাইংপ্রা ঝর্ণার মূল ট্রেক।
### থাকার জন্য স্থানীয় পাড়াই ভরসা
সাইংপ্রা ও আশপাশের দুর্গম এলাকায় পর্যটকদের জন্য প্রচলিত হোটেল বা রিসোর্ট নেই।
রাতে থাকতে হলে স্থানীয় ম্রো পাড়ার কারবারীর সঙ্গে আগে যোগাযোগ করতে হয়।
স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।
### দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত হাঁটতে হতে পারে
আলীকদম ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিন্টু দে জানিয়েছেন, সাইংপ্রার ট্রেকিং মোটেও সহজ নয়।
প্রতিদিন আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত পাহাড়ি পথে হাঁটতে হতে পারে।
রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দীর্ঘ সময় ব্যাকপ্যাক বহন করতে হয়। কোনো কোনো পরিস্থিতিতে পরিকল্পনার চেয়েও বেশি সময় লাগতে পারে।
এ কারণে শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি ছাড়া এই পথে যাওয়া ঠিক নয় বলে মনে করেন তিনি।
### সঙ্গে কী রাখা দরকার
দুর্গম এই ট্রেকিংয়ে শুকনা খাবার, ট্রেকিং ব্যাগ, পানির বোতল, হেডল্যাম্প, স্যালাইন, গ্লুকোজ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বর্ষাকালে রেইন কভার বা পলিথিন, উপযোগী ট্রেকিং প্যান্ট এবং ভালো গ্রিপযুক্ত জুতা বা স্যান্ডেল নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
মশা প্রতিরোধের উপকরণ, গামছা এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় জিনিসও সঙ্গে রাখা ভালো।
পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা শিক্ষার্থী পরিচয়পত্রের ফটোকপিও সঙ্গে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয় ট্যুর গাইডরা।
প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে একেবারে বুনো পাহাড়ি পরিবেশ উপভোগ করতে চান—এমন অভিজ্ঞ ট্রেকারদের জন্য সাইংপ্রা হতে পারে আলীকদমের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য।
তবে যাত্রার আগে আবহাওয়া, স্থানীয় পরিস্থিতি ও পথের নিরাপত্তা সম্পর্কে জেনে এবং স্থানীয় গাইডের নির্দেশনা মেনেই সেখানে যাওয়ার পরামর্শ রয়েছে।

ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।
