নারী কি গাড়ি চালাতে পারেন? ইসলামের দৃষ্টিতে কী বলে শরিয়ত
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২০ পিএম
ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর গাড়ি চালানোকে স্বতন্ত্রভাবে নিষিদ্ধ করে এমন কোনো সুস্পষ্ট কোরআনি বা হাদিসভিত্তিক বিধান নেই। ইসলামী ফিকহের সাধারণ নীতি অনুযায়ী, পার্থিব বিষয়ের মূল বিধান বৈধতা—যতক্ষণ না তা নিষিদ্ধ হওয়ার সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেও নারীদের উটসহ বিভিন্ন বাহনে যাতায়াতের নজির ছিল। তবে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রেও শালীনতা, নিরাপত্তা ও দেশের আইন মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।

ভেরিক্সা নিউজ ইসলাম ডেস্ক
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আধুনিক জীবনে শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, চিকিৎসা, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজন—সব ক্ষেত্রেই যাতায়াত মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন প্রায়ই সামনে আসে—ইসলামের দৃষ্টিতে একজন নারী কি নিজে গাড়ি চালাতে পারেন?
ইসলামী ফিকহের একটি বহুল স্বীকৃত নীতি হলো, ইবাদতের বাইরে দৈনন্দিন পার্থিব বিষয়ের মূল বিধান সাধারণত বৈধতা, যতক্ষণ না কোরআন বা সহিহ সুন্নাহয় তা নিষিদ্ধ করার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।
নারীদের গাড়ি চালানোকে সরাসরি নিষিদ্ধ করে এমন কোনো সুস্পষ্ট কোরআনি আয়াত বা সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। এ কারণে বহু সমসাময়িক আলেম ও ফিকহবিদ নারীর গাড়ি চালানোকে মূলত বৈধ বলে বিবেচনা করেন, তবে তা যেন অন্য কোনো শরিয়তবিরোধী বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত না হয়।
### রাসুল (সা.)-এর যুগে নারীদের বাহন ব্যবহার
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে বর্তমান সময়ের মোটরগাড়ি ছিল না। সে সময় উট, ঘোড়া ও অন্যান্য প্রাণীই ছিল যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম।
হাদিসে কুরাইশ নারীদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রশংসার বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে ‘উটের পিঠে আরোহণকারী নারীদের’ প্রসঙ্গ এসেছে।
এ থেকে বোঝা যায়, নারীদের বাহনে চলাচল সেই সময়ের সমাজে পরিচিত বিষয় ছিল।
ফিকহের দৃষ্টিতে আধুনিক মোটরগাড়ি একটি যাতায়াতের মাধ্যম। ফলে শুধু চালক নারী হওয়ার কারণে গাড়ি চালানোকে হারাম বলার জন্য আলাদা শরয়ি প্রমাণ প্রয়োজন।
### নিরাপত্তা ও প্রয়োজনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ
বর্তমান সময়ে অনেক নারীর জন্য গাড়ি চালানো কেবল ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয় নয়; বরং নিরাপত্তা ও প্রয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত।
জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন, সন্তানকে স্কুলে নেওয়া, কর্মক্ষেত্রে যাতায়াত কিংবা পরিবারের কাউকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে গাড়ি চালানোর দক্ষতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
কিছু পরিস্থিতিতে নিজের গাড়ি নিজে চালানো অপরিচিত পুরুষ চালকের সঙ্গে দীর্ঘ সময় একা যাতায়াত করার চেয়ে একজন নারীর জন্য বেশি স্বস্তিদায়ক বা নিরাপদও হতে পারে।
তবে ‘খালওয়াত’ বা গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের নির্জন অবস্থানের শরয়ি বিধান প্রয়োগ হবে কি না, তা নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও আলেমদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে।
### সংস্কৃতি আর ধর্মীয় বিধান এক নয়
অনেক সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত কিছু সামাজিক রীতিকে কখনো কখনো ধর্মীয় বিধান হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।
নারীদের গাড়ি চালানো নিয়ে বিতর্কেও এমন সাংস্কৃতিক প্রভাব দেখা গেছে।
উদাহরণ হিসেবে সৌদি আরবে দীর্ঘদিন নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা ছিল। ২০১৮ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর নারীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া শুরু হয়।
এই পরিবর্তন দেখিয়েছে যে কোনো দেশের প্রশাসনিক নীতি আর ইসলামের মৌলিক শরয়ি বিধান সবসময় এক বিষয় নয়।
### শালীনতা ও আইন মানা জরুরি
ইসলামে বৈধ কোনো কাজ করার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল আচরণ গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মুসলিম নারী গাড়ি চালালে তার পোশাক, আচরণ ও সামাজিক শালীনতায় ইসলামী মূল্যবোধ বজায় রাখা উচিত।
একই সঙ্গে ট্রাফিক আইন মেনে চলা, নিজের ও অন্যের নিরাপত্তার প্রতি সতর্ক থাকা এবং দায়িত্বশীলভাবে গাড়ি চালানোও গুরুত্বপূর্ণ।
### মূল কথা কী
ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর গাড়ি চালানোকে স্বতন্ত্রভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি—এটাই বহু আলেমের সাধারণ অবস্থান।
তবে গাড়ি চালানোর সঙ্গে যদি কোনো আলাদা হারাম কাজ, অনিরাপদ আচরণ বা আইনের লঙ্ঘন যুক্ত হয়, তাহলে সেই বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচিত হবে।
অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু ‘নারী গাড়ি চালাবেন কি না’—এতটুকু নয়; বরং কীভাবে নিরাপদ, শালীন ও দায়িত্বশীলভাবে গাড়ি চালানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা
ভেরিক্সা নিউজ ফলো করুন
সবার আগে খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।
ফেসবুক পেজের সর্বশেষ পোস্ট — স্ক্রল করে দেখুন। নতুন পোস্ট দিলে এখানে নিজে থেকেই আসবে।


